Saturday, 22 June 2019

নামকরণ

বৃষ্টি এলকি?
পশ্চিমের আকাশে কালো মেঘ, গাঢ়, ঘন, গম্ভীর। সূর্য্য অস্ত যেতে দেরি আছে কিছুটা। পশ্চিমের পথেই পা বাড়িয়েছে , পৌঁছনোর একটু আগেই রাস্তা আগলে দাঁড়ালো কৃষ্ণকায় মেঘের দল। সূর্যদেব বললেন, সেই ভালো লুকিয়ে থাকি কিছুক্ষন এই মেঘের কোলে। মাঝেমাঝে সেই মেঘের মধ্যে থেকে বিচ্ছুরিত হতে থাকলো ইন্দ্রধনুর মতন আপনার সাত রং। আর গভীর আকাশ, একদিকে তার মৌন গাঢ় নীল আর অন্যদিকে কৃষ্ণকালো মেঘের থেকে বিচ্ছুরিত সপ্ত ডিঙ্গার রূপকথায় নিজের গভীর অন্তস্থলের আনন্দ কে বর্ণনা না করতে পেরে শিহরিত হচ্ছে। সেই পুলকিত শিহরণ গোপন রইলোনা, ধরিত্রীর ওপরে, সবুজ বনানী কে মাতাল করে দিয়ে ব্যস্ত পৃথিবীবাসীর কাছে মেঘের গুরুগুরু সে খবর পৌঁছে দিলো। প্রচন্ড তাপ দগ্ধ প্রকৃতি অপেক্ষা করতে থাকলো আসন্ন বর্ষায় অবগাহনের। 
প্রকৃতির এই মধুর খেলা কখন যেন আবার এক রূপকথার স্বপ্নজাল রচনা করেছে। 
মনে পরে যাচ্ছে, বেশ কিছু আগের কথা। কত বয়স তখন? কি জানি। কি যায় আসে তাতে? মন ছিল খুব সবুজ। তুমি চাঁপা আনলে , এনেই বললে নাম দাও। তোমার সব কিছুতেই তখন নাম চাই। আমিও দিলাম। বললাম এ আমাদের সাঁঝবাতি। তুমি বলবে রূপকথাটা? আমি হেসে বললাম , থাকবে লেখা। প্রথম প্রথম সাঁঝবাতির কদর খুব, কবে ফুল আসবে, কচি পাতায় গাছ ভরবে, গন্ধে আকুল হবে আমাদের ১০ টা ৫ টার জীবনগুলো। গন্ধরাজ আর মাধবীলতার মধ্যে হেসে উঠবে সে। অপরাজিতার গাঢ় নীলে হবে তার নতুন অভিষেক। 
সেবারে সাঁঝবাতি ফুল দিলোনা। পাতা গুলো কেমন একটা হলদে হয়ে শুকিয়ে গেলো। তোমার রকমারি ফুলের বাগানে আরো নানান অভিজাত নিত্য নতুন কেয়ারি করা পাতার বাহারে খুব ব্রাত্য হয়ে পড়লো তার উপস্থিতি। আমাদের সাঁঝবাতি জ্বললনা আর কোনোদিন ই হয়তো বা। 
কথা ছিল, বৃষ্টির প্রথম জলে সে ভিজবে। কথা ছিল নতুন ভোরের প্রথম আলোতে সে ঘুম ভাঙাবে। কিন্তু শুধু আমরা কি সব সময় প্রথম আর নতুনকেই খুঁজি সবসময়, চিরন্তন কে নয়? কিজানি। তাই বোধয়। 
একটা ঠান্ডা হাওয়া দিলো, লেমনগ্রাস এর গন্ধ টা কেমন যেন নেশা নেশা। আচ্ছা আজ এতদিন পরে, ধরো যদি কোন প্রৌঢ় চশমার কাঁচটা আর একবার পরিষ্কার করে নিয়ে ফিরে তাকাতে চায়, সেই অভিমানে ভরা সোহাগী দিনগুলোর দিকে। বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ, ভেজা মাটি আর ম্লান হয়ে আসা স্মৃতি কি তাকে মনে করাবে কত বলা না বলা প্রতিশ্রুতির গুলোর কাছে। সাঁঝবাতি উঠবে জ্বলে? নামকরণ সার্থক হবে? 






Sunday, 16 June 2019

Fathers' day

পিতৃত্ব পালনের কোনো স্পেশাল দিন হয়, বা পিতাকে স্মরণ করার? কিজানি, হয় হয়তোবা। জানিনা। আমি তো প্রতিটা দিন তোমাকে মনে করি। প্রতিটা ক্ষণ তোমার দেখানো পথে চলতে চেষ্টা করি। 
তোমার আমার অনেক ফটো ও কোথাও নেই, তখন যে আমাদের যখন তখন ফটো তোলা হতোনা, তুমি আমি আমরা আছি সেই পুরোনো অ্যালবাম এর পাতায়, সেই বোধয় ভালো জানো , সেভাবে আমাদের শুধু তোমার আর আমার কোনো ছবি না থাকাই বোধয় ভালো। পৃথিবীর যা কিছু চিরন্তন যা কিছু অবিনশ্বর তাই তো নাকি সবসময় থাকে অগোচরে, চোখের আড়ালে, তাই এই বেশ ভালো। তোমার মান্তুর আর তার বাবার একসাথে কোনো ফটো নাহয় নাই রইলো তবে। 

তুমি আমার সবথেকে বড় ভরসা। ছিলে যেমন আজও তো তাই আছো। ল্যাব এ pcr না হলেও তুমি, মনখারাপ হলেও তুমি, মেনি কে অনেক্ষন দেখতে না পেলেও তুমি বা কোন গাছে কি ফুল হয়েছে তাতেও শুধু তুমি ই। আজ আর সেই তুমি চলে যাবার দিনটাকে মনে করতে চাইনা। কিভাবে কেমন করে যে তুমি তোমার ছোট মান্তুকে হটাৎ অনেকটা বড় করে দিলে, সেসব কথাও থাক আজ। শুধু তুমি সবসময় আশীর্বাদ করো সেই বজ্রকঠোর কুসুমকোমল চরিত্র টা নিয়ে আমি যেন সগর্বে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে পারি। 

ভালোবাসা দুর্বলতা নয়, ভালোবাসা ভালোবাসাই। আবার তেমন ই অনেকের অনেক কিছু হাসিমুখে মেনে নেবার মানেই হেরে যাওয়া নয়, তাদের করুণা করাও তো হতে পারে। এই সব বোধ এখন আমার মধ্যে জাগরিত। এই বোধ গুলোকে আমি বিশ্বাস করি, সঙ্গে নিয়ে চলতে চাই। 

জানো বাবা, যত বড় হৈ , একটা একটা করে দিন যায়, বুঝতে পারি, তোমার দেখানো পথে চলা সহজ নয়, খুব কঠিন তা। 
জানোতো সেদিন খুব কষ্ট হয়েছিল, যখন আমি শুনেছিলাম আমি সবার কাছে ভালো থাকার জন্যেই নাকি সব কিছু করি। মনে পড়লো, এইরকম কথা একবার অনেকদিন আগে, তোমাকে কেউ বলেছিলো, তুমি নাকি ওই যে সব কিছু হাসিমুখে মেনে নিয়ে, বাইরের যত আঘাত সব নিজের ওই বুকের মধ্যে রেখে দাও, কেন করো তা, কেন কিছু বলোনা। তোমাকে কেউ কোনোভাবে এতটুকু আহত করলো মনে হলে, বা তার এতটুকু আভাস ও পেলে তোমার মান্তু যেন ভেঙে চুরচুর হয়ে যেত। ভীষণ রাগ হতো। সেদিন ওই লোকের কাছে ভালো থাকার কথাটা শুনেও মনে পরে গেছিলো হটাৎ, তোমার ওপর কিছুটা ঐরকম ভাবেই করা সেই অভিযোগ। ভালোবাসার ই অনুযোগ ছিল তা যদিও, তবু ছিল তোমাকে না বুঝে করা। আর সেটাই আমার বুকে বেজেছিল। তবু আজও তুমি আমাকে সেভাবেই রেখো বাবা, যেভাবে তুমি আমাকে গড়েছ। 

কঠিন যেখানে হবার, সেখানে যে আমি কতটা কঠিন, তা তো তুমি জানোই, সেইরকম কঠিন যেন না হতে হয় আমায় কারোর ওপরে, সেই কাঠিন্য কে আমি নিজেই ভয় পাই। তোমার মান্তু যেন তোমার আদোরে কুসুমকোমল হয়েই সবার কাছে আসতে পারে। বজ্রকঠিনতা তার থাকবেই। 

রেখো আমাকে ঠিক যেভাবে তুমি দেখতে চেয়েছো তোমার মান্তুকে। আর শোনো, কোনো চিন্তা করোনা, তোমার মান্তু ভালো আছে। খুব ভালো থাকবে সে। কিছুটি ভেবোনা। সব ভালো আছে। অনেক অনেক কথা আছে তোমার সাথে, কিছুই যেন আর বলতে গিয়ে বলা হয়ে ওঠেনা। মনে হয় আরো কত কথা, আরো অনেক। আরো অনেক। তারপর আরো থেকে যায় কথা। আরো। তোমার কাছে গুছিয়ে ভেবে চিনতে কথা বলার তো আর কিছু নেই, সব তোমার জানা। শুধু তুমি দেখো চারপাশের অনেক আঘাত অনেক হতাশা অনেক না পাওয়া, কিছুতেই যেন তোমার মান্তুকে তুমি যেভাবে তৈরি করতে চেয়েছো, সেখান থেকে সে সরে না আসে। আমাদের সময়ে ফাদার্স ডে জানতামনা, জানতামনা mothers day ও , আজ যদি তুমি সামনে থাকতে তুমি না চাইলেও জোর করে তোমার ভালোলাগার জিনিসে জিনিসে তোমায় ভরিয়ে দিতাম একেবারে। জানি তুমি বকতে, কিন্তু তবু দিতাম, জোর করে দিতাম। খুব জোর করতাম। আমার হাতে তুমি সেই যে বাঁধাকপির তরকারি খেতে পছন্দ করতে সেটাও রান্না করতাম হয়তো, হয়তো সেই আলু ডাঁটা বেগুন দিয়ে মাছের ঝোল টাও হয়তো করতাম। 😊সে যাই হোক, মনখারাপ করবোনা, আমি জানি তোমার মান্তুর এতটুকু মনখারাপ বা গম্ভীর মুখ তুমি সহ্য করতে পারোনা। তাই পরের জন্ম বলে যদি কিছু থেকে থাকে, তুমি আবার আমার বাবা হয়েই এসো , তোমাকে রোজ সকাল বেলায় ঘুম থেকে উঠে প্রণাম করে আমার দিন শুরু করবো। 

Wednesday, 5 June 2019

ছাতা

দিল্লিতে থাকাকালীন সেভাবে কেউ ছাতা ব্যবহার করেনা , তবে এবারে কলকাতা গিয়ে বুঝলাম ছাতার অনস্বীকার্য ভূমিকা। ছাতা অর্থাৎ কিনা যে ছায়া দান করে। ছোটবেলাতে আমার একটা রঙ্গীন ওই যে রংবেরঙের ছাতা হয়না, ঐরকম একটা ছাতার খুব শখ ছিল। খুব ইচ্ছে হতো, ঐরকম একটা ছাতার। কিন্তু ওই যে মা বলেছিলো, বায়না করতে নেই কখনো। সেটা নাকি ভীষণ একটা খারাপ জিনিস। ফলত ওই ইচ্ছেটা মনের ভেতরেই থেকে গেছে কখনো আর সামনে আসেনি। সে যাই হোক, আজকে ছাতা নিয়ে লিখতে বসে, প্রথমেই মনে পরে গেল আমার বাবার যে একটা ঢাউস কালো রঙের ছাতা ছিল তার কথা এবং তারপরেই মনে পরে গেল সেই রং বেরঙের ছাতার কথা, যেটা সেই সময়ে আমার কোনো এক বন্ধু নিয়ে আসতো স্কুল এ এবং যার ওপরে আমার যার পরনাই লোভ হয়েছিল। অবাক হলাম এই দেখে যে এই এত বছর পরেও সেই রঙ্গীন ছাতার স্মৃতি এক ই ভাবে মনের মধ্যে ঢেউ তুললো। অর্থাৎ কিনা কোনো ইচ্ছে, কোনো চাওয়া পাওয়া, ভালোলাগা, তা সে যত ক্ষণিকের বা যত তুচ্ছই হোকনা কেন , কিছুই আমাদের ছেড়ে যায়না। সেই ভালোলাগার তরী বেয়ে আমার কাছে এসে পৌঁছনো এক দাবি কে রাখতে গিয়ে শুরু করলাম এই ছাতা বৃত্তান্ত। বলা বাহুল্য যে এ দাবী মেটাতে আমার খুব ভালো লাগছে। চিরকাল ই চেয়েছি আমার ওপর কেউ অধিকার বোধ দেখাক, ভালোবাসার জোর করুক। এমনকি ভালোবাসার সেই জায়গা থেকে কেউ আমাকে তুই এই শাড়িটা পর, বা ওই জুতোটা, বা ওই জামাটা  বা ওই কানের দুলটা খুলে ফ্যাল বা ইত্যাদি ইত্যাদি এমন সব জোর ই যা আপাত দৃষ্টিতে খুব কম মেয়েই মেনে নিতে পারে, তা করে, তাহলে আমার থেকে খুশি কেউ হয়না। সেই কারণেই আমার মায়ের পছন্দ নিজের অপছন্দ হওয়া সত্ত্বেও মেনে নি, কিছুটা সময়ের জন্যে। তবে সে যাই হোক, এই ছাতা প্রসঙ্গে আমার বাবার সেই বড় কালো ছাতাটির কথা না বললে ছাতা কাহিনী নিতান্তই অসমাপ্ত থেকে যাবে। কারণ আদ্যন্ত কাল আমি ওই কালো ছাতাটি দেখেই বড় হয়েছি। তার বাঁট টিও বাঁকানো এবং কালো রঙের। গ্রীষ্ম কালে ওই ছাতাটি সবসময় না থাকলেও বর্ষাতে বাবার সবসময়ের সঙ্গী ছিল ওই ছাতাটি। আর কারোর বাবার হাতে অমন ছাতা দেখতামনা, শুধু আমার বাবার ই অমন পুরোনো আমলের ছাতা। ফ্যাশন সম্পর্কে বেশ সচেতন হতে শুরু করেছি তখন। ফলত ছোট ছোট ফোল্ডিং নানান রঙের ছাতার সামনে বাবার ওই ঢাউস কালো ছাতাটির ওপরে আমার ছিল যার পরনাই রাগ। কেন বাবা শুধু ওই ছাতাটা নিয়েই যায়, বিয়ে বাড়ি থেকে অন্নপ্রাশন কি রোজের স্কুল এ যাওয়া, সবেতেই কালো বাঁকানো বাঁটের লম্বা ইয়া বড় একটা ছাতা হাতে একমুখ হাসি নিয়ে আমার বাবা। কতবার বকতাম বাবাকে, তুমি কেন ছোট ছাতা নাওনা গো, সবাই কেমন ছোট ছাতা নেয়, বাবা বলতো, অরে আমি এত লম্বা, আমাকে পুরোটা বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচাতে গেলে তো এইরকম বড় ছাতাই চাই .খুব ই সহজ সোজা উত্তর। কি আর বলবো। এখন ভাবলে খুব গর্ব হয়। ছাতা নিয়ে সবাই যখন ফ্যাশনেবল, বাবা ভুলেও ভাবতোনা, লোকে কি বলবে কি ভাববে, কিভাবে নেবে। শুধু মিটিমিটি হেসে নিজের যেটা মনে হতো, সেটাই করে যেত। এমন ই ছিল আমার বাবা। কত স্ট্রং ছিল তার will power , কিন্তু কাউকে কিছু বুঝতেই না দিয়ে।
ওই ছাতাটা আর ছাতার অনেকগুলো বাঁট এখনো রাখা আছে। তখন যে জিনিসটার ওপরে খুব রাগ হতো, এখন সেই জিনিসটাকে যেন আঁকড়ে ধরে থাকতে ইচ্ছে করে। মনে হয় একবার ওই মানুষটা আসুক, আসুক সামনে একবার ওই ছাতাটা নিয়ে। খুব গর্ব ও হয়। আমার বাবা যে অন্য আর সবার মতো ছিলোনা। সেই শার্লক এর দাদা মাইক্রফট হোমস এর মতো একটি লম্বা কালো ছাতা বাবার সঙ্গী। পরে এখন দেখি, ইংল্যান্ড এর খুব অভিজাত ফ্যামিলি তে ঐরকম ছাতা নেওয়ার চল আছে। 

যাই হোক, যে কথা বলছিলাম। বলছিলাম অধিকার বোধ এর কথা, দাবী। একটা ছাতা কি আর এমন গুরুত্ব পূর্ণ জায়গা হতে পারে, যে যার জন্যে মাথার যন্ত্রণা থেকে শুরু করে হাতের হাজারো কাজ তুচ্ছ করে অনায়াসে আবোল তাবোল বকবক করতে পারা যায়, একথা আগে বুঝিনি। এখন কথা হচ্ছে এই যে, আজ থেকে ৩০ বছর আগে যদি আমাকে কেউ বলতো ছাতা নিয়ে লিখতে তাহলে আমি কি লিখতাম। তখনো কি আমি এইভাবে লিখতাম যে ছাতা শব্দটি এসেছে ছা ঋতুর রি সমাস থেকে, বা ইত্যাদি ইত্যাদি। নাহ , নিশ্চই এভাবে শুরু করতাম। 

লিখতাম , আমার একটা গোলাপি রঙের ছাতা আছে। গোলাপি রংটা হলো ওর কাপড়টা , বেশ কিছু মেটাল রিব দিয়ে আর একটা স্টিল এর পোলের ওপরে ওই গোলাপি কাপড়টা আটকিয়ে এই যে জিনিসটা আছে, পাপাই বলেছে এটার নাম ছাতা। এখন বাইরে খুব গরম, আমি যখন ই বাইরে বেরোই বা স্কুল এ যাই, এই ছাতাটা নিয়ে যাই। এই ছাতাটা আমাকে সূর্য্যের তাপ থেকে রক্ষা করে। আবার যখন বৃষ্টি পড়ে , তখনো আমি এই ছাতাটা নিয়ে যাই, তাতে আমার গায়ে আর জল পড়েনা। এর থেকে আমার মনে হয়েছে যে যা ছায়া দেয়, বাইরের রোদ , ঝড় , জল থেকে আমাদের বাঁচায় তাই হলো ছাতা। মাঝেমাঝে আমি এই ছাতাটা নিয়ে ঘর ঘর খেলিও, এই ছাতা টা টাঙিয়ে তার ভেতরে গিয়ে আমার পুতুলদের নিয়ে গিয়ে বসি। বেশ লুকোচুরি খেলার মতন আমাকে কেউ দেখতে পায়না কিন্তু ওই ছাতার নিচে আমি বসে থাকি। শীত, গ্রীষ্ম বা বর্ষা বছরের সকল সময়েই ছাতা দরকার হয়। ছাতা সাধারণতঃ দুরকমের হয় (collupsable and non collupsable) কোনো কোনো ছাতাকে গুটিয়ে ছোট করে নেওয়া যায়, আবার কোনো কোনো ছাতা লম্বাই থাকে, তাকে গুটিয়ে নেওয়া যায়না।

ইতিহাস বলে প্রথম ছাতার ব্যবহার শুরু হয় চীন দেশে, এবং যথাক্রমে (প্রাচীন) মিশর, গ্রিস এবং আমাদের দেশ ভারত এ। তবে সমসাময়িক ইউরোপিয়ান বিভিন্ন দেশেও ছাতার ব্যবহার শুরু হয়। এবং পরে ব্রিটিশ শাসনকালে ইংরেজ দের হাত ধরে এদেশে আসে নানান রং বেরঙের হাল ফ্যাশনের ছাতা। বর্তমানে পৃথিবীর সমস্ত দেশ এই ছাতার ব্যবহার করা হয়। ১০ th february কে বিশ্ব ছাতা দিবস বা national umbrella day হিসেবে পালন ও করা হয়। বার্বি থেকে শুরু করে নানান জাপানী পুতুলের হাতে খুব সুন্দর সুন্দর ছাতা থাকে।

পাপাই বলেছে, ছাতা শব্দ টা এসেছে সংস্কৃত শব্দ ছত্র থেকে। হিন্দু, বৌদ্ধ আর জৈন ধর্মের কাছে ছাতা খুব একটি শুভ চিহ্ন। যার সূত্র ধরেই অনেক দেব দেবীদের মাথায় ছাতা দেওয়ার একটি রীতি আছে, এবং একসময় বিভিন্ন রাজা রাজরাও যা নিজেদের আভিজাত্য দেখানোর ক্ষেত্রে বহন করে থাকেন। ছাতার ইংরাজী প্রতিশব্দ হলো umbrella.
ছাতাটা যেন আমার পাপাইয়ের মতন। আমার পাপাই যেমন সব কিছু থেকে আমাকে বাঁচিয়ে রাখে, আগলে রাখে, এই ছাতাটাও যেন তাই।

ছাতা টা বাবার মতন না বাবারা ছাতা হয়ে আমাদের সবকিছু থেকে আগলে রাখে, ঢেকে রাখে সে কথা ঠিক করে বোঝার ক্ষমতা আমার তখন ঠিক হয়নি, কিন্তু এখন হয়েছে। এখন বুঝতে পারি, বাবারা সত্যি ই ছাতার মতন করে আমাদের কে বাহ্যিক যা কিছু অসহনীয় তার থেকে ঢেকে রাখে, আগলে রাখে। প্রতিটা পদক্ষেপে ঠিক কোথায় কোথায় কি কি করতে হবে, কিভাবে গেলে তাঁর সন্তান সুরক্ষিত থাকবে, এমনকি শুধুই ওই মুহূর্তের জন্যে নয়, চিরকালীন চিন্তা করে, ভবিষ্যতে ও যাতে সে এক ই ভাবে সুরক্ষিত থাকতে পারে, এইসব ভেবে, আমাদের এক একটা পদক্ষেপের আগে থাকে ওই মানুষটার এই এতকিছু ভাবনা।
তাইতো শুধু ছাতা নয়, যখন অনেক বড় বড় কোনো গাছ দেখি, মহীরুহ , এইরকম মোটা মোটা গাছের গুঁড়ি , গায়ের রং কেমন একটা কালচে বাদামী , বিশাল বিশাল ডাল পালা পাতা, অনেক রোদের মাঝেও যার তলায় গিয়ে দাঁড়ালে সমস্ত দেহমন শীতল হয়ে জুড়িয়ে যেতে বেশি সময় লাগেনা। খুব রোদে তাপে পথ যখন রুক্ষ হয়ে রাস্তা আগলে দাঁড়ায়, তখন মনে মনে আমরা খুঁজে চলি এমন ই কোনো মহীরুহ কে, মনে হয় একটু দাঁড়াই কাছে গিয়ে, একটু বসি এর তলায়। ওই শান্তির আশ্রয়টাই অনেকটা পথ হেঁটে যাবার শক্তি জুগিয়ে দেবে। খুব ভাগ্যবানরা তাদের মা বাবাকে জীবনের অনেকটা পথ পর্যন্ত পায়, তাদের আলো ছায়ায় ভরিয়ে রাখার জন্যে, ছেলেমেয়ের ছাতা হয়ে থাকার জন্যে। আর আমার মতন হতভাগ্য যারা যারা জীবনের কিছু টা চলেই ওই ছায়া থেকে বঞ্চিত হয়, তখন মাথা কুটে মরে গেলেও সেই স্নেহময় মধুর ছায়াটি যেন কিছুতেই পাওয়া যায়না। তবে না হয়তো বা এটা ঠিক ব্যাখ্যা হলোনা বা, কারণ physically ওই মানুষটাকে কাছে পাই বা না পাই, তাঁর স্নেহচ্ছায়া থেকে বঞ্চিত আমি একথা কখনো ঠিক নয়। কখনো নয়। তাঁর স্নেহছায়া আছে বলেইতো সব কাজে এত জোড় পাই, শক্তি পাই। তবে হ্যাঁ এটাও ঠিক যে কখনো কখনো ওই ছাতার মতো কাউকে সামনে থেকে সত্যি পেতে খুব ইচ্ছে করে। আমরা যে রক্ত মাংসের মানুষ। তাই নয়নের সম্মুখে না থেকে নয়ন মাঝে ওই মানুষটা ঠাঁই নিয়ে আছে জেনেও, তাকে নয়নে সম্মুখেই তবু চাই। বাবারা যেভাবে আগলে রাখে, তা কেউ ই পারেনা কখনো। তবে জীবনে চলার পথে বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষ কখনো কখনো আসে, তাদের মধ্যে, না ছাতা হয়ে হয়তো কেউ আসেনা তবে তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছাতা হাতে করে নিশ্চই আসে। কিছুটা সময় কিছুটা রাস্তা ওই যে যতটা আমাদের ভাগ্যে বরাদ্দ থাকে, ততটা রাস্তা বেশ নিশ্চিন্তে হাঁটা যায়। মনে হয় এখানে আমার মাথা ঘামানোর দরকার নেই, দরকার নেই অকারণ চিন্তার। আমার কাজ শুধু হেঁটে যাওয়া। পাশের মানুষটার ছায়ায় বেশ নিশ্চিন্তে আমি চোখ বন্ধ করে হেঁটে যেতে পারি।

আজ যখন বাবা আর কাছে নেই, তার সেই ঢাউস ছাতার নিচে তার আদরের মান্তুকে আগলে সমস্ত রোদ, ঝড়, জল থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে চলার (physically), তখন ও মনে এখনো চোখ বন্ধ করে সেই ছবিটাই ভেসে আসে, আর মন বলে, এই মান্তু তো নাহয় বড় হয়ে গেছে অনেক। কিন্তু আরো ছোট্ট মান্তু যেন ওই ছাতাটা পায়। ঠিক করে। যেন ঝড়, বৃষ্টি, রোদের আঁচ না লাগে তার গায়ে।  

Tuesday, 4 June 2019

কানায় কানায়

টলটলে শান্ত স্থির শীতল দীঘির ধারে থাকতো এক মাছরাঙ্গা। শান্ত সবুজ আলোছায়া ঘেরা গাছগাছালি। ঝিকিমিকি দীঘির জল।  দিন যাচ্ছিলো তার নিজের মতো করে। দীঘির জল এ  ডুব দিতো, মাছ নিয়ে মুখে করে তার ছোট্ট বাচ্ছা মানুষটাকে দিতো, তারপরে ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমীর গল্প বলতে বলতে কখন ঘুমিয়ে পড়তো। একটু একটু করে ওই তার ওই ছোট্ট ছানা টিকে বড় হতে দেখতে দেখতে তার দুচোখ আশায় গর্বে ভোরে উঠতো। এইভাবে রূপকথার জগতে তরী বেয়ে তার দিন কাটছিলো। 

এমন সময় একদিন ধ্যানমগ্ন মাছরাঙ্গা যখন দীঘির ধারে চুপ করে বসেছিল, হয়তো বা তার চোখে ছিল কোনো মেঘের ছায়া। সময়টা ছিল শীতকাল। দেশ বিদেশের পরিযায়ী পাখিরা তার এই সুন্দর গ্রাম বাংলার ছায়া সুনিবীড় শান্তির নীড় এ আসছিলো, যাচ্ছিলো। সেইরকম কোনো এক বিষন্ন বিকেলে, শীতের আসন্ন সন্ধ্যের নিস্তব্ধতার মধ্যে দেখা হলো এক পরিযায়ী পাখির সাথে। অনেকটা আমাদের দেশের চড়াই পাখির মতো যার আকার আয়তন, অর্থাৎ কিনা মাছরাঙ্গার থেকে অনেক পুচকে মতন ছিল সেই পাখি। সাদা রঙের পালকে ঢাকা, আর দলের নানান সঙ্গীদের থেকে ছিল একেবারেই সাধারণ তার চাল চলন আহার বিহার। তা সেই পাখি তার চোখে দেখলো আসন্ন রাত্রির ছায়া। জানতে চাইলো কারণ, বললো এইতো রাত পেরিয়েই আবার ভোর হয়ে যাবে, কেন তবে তুমি মনখারাপ করে আছো। মাছরাঙ্গা বললো বসবে আমার পাশে, আমার এই স্থির শান্ত দীঘির ধারে। পরিযায়ীর মনে ছিল চিরকালীন থিতু হবার স্বপ্ন। বসলো সে। তারপরে কত কথা কত কাহিনী। যেন জন্ম জন্মান্তর ধরে দুই ভিন্ন দেশী ভিন্ন পরিস্থিতির পাখির মনে জমেছিলো কত হাজারো না বলা গল্প। ধীরে ধীরে সেই একদিনের অল্প আলাপ পরিণত হলো গভীর বন্ধুত্বে। মাছরাঙ্গার মনে হলো তার যে এমন এক সুন্দর গাঢ় নীল রং আছে, একথা এমন ভাবে তো তাকে কেউ বলেনি, আর পরিযায়ীর মনে হলো তার এই যে সাদা রংটাকে সে এতদিন খুব সাধারণ ভেবে এসেছে, তা সত্যি ই কাউকে রঙ্গীন করে তুলতে পারে? এইভাবে কিছুদিন স্বপ্নের মতো কেটে চললো। পরিযায়ীর ফেরার পালা, মন চায় তার স্থির নিস্তরঙ্গ এক জলতরঙ্গ। চির শান্তির আশ্রয়। আর মাছরাঙ্গার ক্ষণিকের জন্যে মনে হলো, আমিও যদি যেতে পারতাম দূর থেকে দূরে। "নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপারে তে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস। " তারা দুজনেই না পারে, তাদের আপন আপন বৃত্ত ভেঙে বেরোতে, না পারে সেই বৃত্তের ভেতরে থাকতে। এমনি এক অবস্থায় পরিযায়ী বারবার চলে আসে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে সেই ঝিলের ধারে , দুজনের দেখা হয় কিন্তু তাতে আরো বেশি কাছে পাবার ইচ্ছে প্রবল হয়ে ওঠে। পরিযায়ী ভাবে এ কি বিড়ম্বনা। এ দেখা নাহোলেই ছিল বেশ ভালো আর নীলকণ্ঠী মাছরাঙা ভাবে দেখা হয়েছে যখন,তখন এর কিছু শুভ উদ্দেশ্য নিশ্চই আছে। ওপর থেকে বিধাতা হাসেন। আর এভাবেই দুই দূর প্রান্তের দুই ভিন্ন পরিস্থিতিতে থাকা মন নিজেদের মতো করে একে অপরের কর্তব্য পালন করে চলে, আবার সেই দুই মন নিজেদের মতো করে একে অপরের কাছে আসে। তাদের ভিন্ন জায়গা, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন আচার বিহার, তবু কি যেন এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন তাদের একে অপরকে রেখেছে বেঁধে। 
আসলে ক্ষুদ্রতর জায়গায় যা আলাদা, বৃহত্তর ক্ষেত্রে তাই যে এক। ধরো পৃথিবীর এক প্রান্তে যখন দিন অন্যপ্রান্তে তখন রাত , একদিকে যখন ঠান্ডা অন্যদিকে তখন গরম অথচ আবার যখন বৃহৎ বৃহৎ অনেক বৃহত্তর বৃত্তে আপন আপন গন্ডির বাইরে গিয়ে যদি আমরা ভাবি, তখন দেখি একটি ই সূর্য্য এই কান্ডটি ঘটাচ্ছেন , সেই এক ই সূর্য্যকে আমরাও দেখছি আবার দেখছে অপর পক্ষের সবাই ও। আকাশ ভরা তারা জায়গা বিশেষে পর্যোবেক্ষণের অবস্থান বদলায় ঠিক ই কিন্তু যার পরিপ্রেক্ষিতে তা বদলায় সেই বিশাল অসীম মহাবিশ্বের প্রেক্ষাপট যে একটি ই। সেই এক ই আকাশ। এক টি ই চাঁদ। যে চাঁদ দেখে রবিঠাকুর বলে উঠেছিলেন "চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে", সেই চাঁদ দেখেই আবার Wordsworth বলেছেন "The Crescent-moon, the Star of Love, /Glories of evening, as ye there are seen".    
তবু রক্তমাংসের বাস্তব দুনিয়াতে এমন দার্শনিক কথা মেনে এবং মনে নিয়ে চলা খুব দুষ্কর। ফলত: ঝড় উঠতো, এবং সেই ঝড়ে কখনো আমাদের নীলকণ্ঠী অভিমানে গলা ফুলিয়ে বসে থাকতেন, কখনো বা শুভ্র চড়াইটি মুখ কালো করে অভিমানে মুখ লুকোতে। নীলকণ্ঠীর মনে হতো তুমি তো আর কখনো আমার হয়ে থাকবেনা, কেন তুমি আমার হয়ে থাকতে পারোনা? অভিমানে তার গলা ধরে আসতো, চোখে আসতো জল, মনে হতো এসব মিথ্যে, কখনোই পরিযায়ী আমার হবেনা, একদিন ঠিক আমাকে ভুলে অনেক দূরে চলে যাবে। পরিযায়ীর মনে হতো, নীলকণ্ঠীর নিজের দুনিয়াতে সে বড় ব্রাত্য। কেনই বা সে তার সুন্দর স্থির নিস্তরঙ্গ জল এ ঢেউ তুলে যাবে? নাহ এ তার কখনোই ঠিক নয়, এভাবে তার শীতল দীঘিতে ঢেউ তোলার সে কেউ ই নয়। সে আর কখনো নীলকন্ঠীর বৃত্তের ভেতরে আসবেনা। এমন কথা শুনে নীলকন্ঠীর হতো রাগ, সে প্রমান করতে বসত যে বস্তুতঃ ই  তার দীঘির জল না ছিল কখনো শান্ত, না ছিল কখনো শীতল। পরিযায়ী চড়াই দিতো কানে আঙ্গুল, কিছুতেই সে শুনবেনা। এভাবেই সময় পেরোচ্ছিলো। 

এই দুটির কথা অলক্ষ্যে জানতেন শুধু একজন, তিনি চুপচাপ মিটিমিটি হেসে লিখে চললেন কাহিনী। সে কাহিনীর শুরু কিভাবে কোথায় বা শেষ সে সব কথা ধীরে ধীরে হলো অপ্রাসঙ্গিক। সে কাহিনীতে সত্যি হয়ে রইলো শুধু ঝিলের শান্ত নিস্তরঙ্গ জল, ঝিকিমিকি সূর্যের আলো, কালো পিচ ঢালা রাস্তা, শীতের উষ্ণ আদর, গ্রীষ্মের দাবদাহ, বর্ষার জল, ভরা নদী, অপরাজিতার গাঢ় নীল, গোলাপের পাপড়ি, জুঁই এর শুভ্রতা, গন্ধরাজের মত্ততা, কৃষ্ণচূড়ার লাল, চাঁপার মৃদু অথচ উজ্জ্বল মধুর তেজ, সুবাসিত রাত্রি, ভোরের স্নিগ্ধতা, নতুন দিনের আশা, সোনালী বিকেল, গোধূলির আবেশ, ধূপের গন্ধ, ধুনোর ঘোর, শঙ্খ ধ্বনির শান্তি, কাঁসার থালার সাবেকিয়ানা, খাওয়ানোর আকুলতা এমন কত কি। আর এই সব কিছু আবর্তিত হতে থাকলো ওই একটি ই সূর্য্য , একটি ই চাঁদ , এক ই আকাশ ভরা তারা, আর একরকম রং এক ই তুলি দিয়ে আঁকা একরকম স্বপ্নকে ঘিরে। সেই স্বপ্নই তাদের নিজ নিজ জায়গার ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে তাদের স্থির রাখতো, জোর দিতো মনে, দুর্বলতা নয়, শক্তি হয়ে থাকতো , আর দিনের শুরুতে তাদের মনে হতো আর একটা নতুন দিন, আর একটা নতুন স্বপ্ন, আরো একবার নিজেদের সব কিছু জেনে নেবার বুঝে নেবার সময়। আর দিন শেষে তারা সারাদিনের ছোটো বড় সকল প্রাপ্তিকে একে অপরের সাথে ভাগ করে নিয়ে চলতে থাকলো। 

না প্রয়োজন কিছুমাত্র ছিলোনা এদের একে অপরকে, কিন্তু সকল প্রয়োজন সব স্বার্থের থেকে উর্ধে উঠে এই যে সম্পর্ক, এর নাম আমার জানা নেই, জানা নেই হয়তো বা এ বিশ্বের সেই মহাকাল সেই মহাকবির ও। তাই হয়তো তিনিওবা তখন আপন লেখনী থামিয়ে অবাক নয়নে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এ পৃথিবীর বুকে সূর্য্যকে বললেন আরো মধুর হয়ে উঠতে, চাঁদ কে বললেন আরো স্নিগ্ধ আরো নরম হয়ে আদর হয়ে জড়িয়ে রাখতে, আর ফুলে ফলে রঙে রসে সবুজে সবুজে ভোরে দিতে প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটি ক্ষণ। প্রতিদিনের যে বাঁচা সকল স্বার্থের থেকে উর্ধে এসে থাকতে পারে, যার মধ্যে এতটুকু স্বার্থের ছোঁয়া থাকেনা এমন গভীর বোধের গোপন প্রাপ্তিকে কেউ না বুঝুক শুধু তার ব্যাপ্তিটুকু এই দুই মন কে কানায় কানায় রাখুক ভরিয়ে। সেই দুই মনের গভীরে তাই সকল কলুষতা হিংসা স্বার্থ হানাহানি কাড়াকাড়ি লড়াই কিছু প্রবেশ করতে পারেনা, সকল অশান্তি যেন ঠিক ওই দীঘির জল এর মতোই স্থির শান্তি নিয়ে এসে দুই মনকে একেবারে ভিজিয়ে দিয়ে যায়, আর সেই ভেজা মনের নরম মাটিতে জন্ম নেয় নব বোধের কচি সবুজ চারাগাছ; ভালোবাসায় আদোরে সোহাগে যত্নে তাতে ফুল আসে, ফল হয়, সবুজ চারাগাছ পরিণত হয় মহীরুহে , ছায়া দেয়। আর সেই ছায়া, নতুন উজ্জ্বল আলোর সাথে মিশে গিয়ে এক অদ্ভুত মায়াজাল রচনা করে এই দুই মনকে পরিপূর্ণ করে রাখে। কানায় কানায়। এর যেন বিরাম নেই, বারণ নেই, নেই থেমে যাওয়া, সেই যে একসময় কালিদাস যেমন লিখেছিলেন সেইরকম ই বলতে ইচ্ছে করে, সহস্র বৎসর যেন এইভাবেই এক লহমায় পেরিয়ে যায়। এই কানায় কানায় পরিপূর্ণতা যেন সকল অপ্রাপ্তি, সকল অন্ধকারকে একেবারে আলোয় আলোয় প্রাণ দিয়ে ভরিয়ে দেয়। কানায় কানায়। 

বাইরে ঝলমলে রোদ্দুর ভরা একটা দিন , ভীষণ নীল আকাশ। আমার বাড়ির সামনের ম্যাপল গাছের পাতা প্রায় সব ই ঝরে পড়ে গেছে। দুদিনের জন্যে এত সৌন্দর্য্য ন...