দেখতে দেখতে এক বছর হয়ে গেলো, ছোট্ট ছেলেটা স্কুল এ যাচ্ছে। স্কুল মানে playschool বা daycare. এদেশে ওয়ার্কিং পেরেন্টস দের ছোট্ট ছোট্ট ছানা দের take care করার মতন ভীষণ সুন্দর ব্যবস্থা আছে,
যদিও দেশে থাকতে এ নিয়ে গুজবের শেষ ছিলোনা, এবং নিজের মনেও খুব ভয় ছিল কিন্তু নিজে এক্সপেরিয়েন্স করে বুঝলাম দূর থেকে কত ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে কত ভয় আমরা নিজেরাও পাই আর তার থেকেও বেশি ভয় ছড়িয়ে দি মানুষের মনে। পরে কখনো সময় পেলে বলবো সে কথা বিশদে কিন্তু তার আগে যে জন্যে আমার মা মন আজ কলম ধরলো সে কথা বলি, এই একটা বছরে আমাদের ছোট্ট ছেলেটার এক এক পা করে এই বেড়ে ওঠা বড্ড সুন্দর।
এই বিদেশের মাটিতে প্রবাসী জীবনে একা একা একটা ছোট্ট মানুষ কে বড় করে তোলা খুব সহজ কথা নয়। কিন্তু আজ পিছন ফিরে যখন প্রতিটা দিনকে দেখি আর বর্তমানের এই ছোট্ট মানুষটা কে দেখি তখন মনে মনে এটুকু যেন ভরসা পাই পারবো। পারছি। বড় তো সবাই হয়েই যায়, কিন্তু একটা সুন্দর মন নিয়ে বেড়ে ওঠা? সেটা পারবো তো? প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮ টা তে ব্রেকফাস্ট করে একদম রেডি হয়ে আমরা বাড়ির গেট এ যখন দাঁড়াই তখন প্রচন্ড গ্রীষ্মেও খরতাপ শুরু হয়না, সকাল টা নরম হয়ে যেন আমাদের দিকে তাকায়। এখানে পাওনা urbanization এর পাশাপাশি প্রকৃতি। দুরন্ত আড়াই তখন চায় দৌড়ে যেতে, আর চল্লিশোর্ধ তাকে ধরে বেঁধে stroller এ বসায় । সে তখন বসে বসেই অলমোস্ট নেচে নেচে চলতে থাকে, গাড়ি তে নয়, সকালে স্বেচ্ছায় ছোট্ট ছানা কে নিয়ে টানা দেড় মাইল হাঁটাটা শুধু ওয়ার্ক আউট নয়, দিন শুরুর আগে সব কাজ সেরে, রান্না করে, লাঞ্চ প্যাক করে, একটা ছোট দুরন্ত বাছা কে রেডি করে ব্রেকফাস্ট করিয়ে বেরোনোর যে জানা যুদ্ধ টা প্রায় সব মা বাবা কেই কম বেশি করতে হয় , এটা যেন থাকে তার মধ্যে একটা মেডিটেশন এর মতন। দিনের শুরুতে কাজের দুনিয়াতে ঢুকে যাওয়ার আগে একটা মেডিটেশন।
দেড় বছরের এই এতটুকু মানুষটা এই সময় থেকে আকাশ কে চিনতে শুরু করেছিল, দিনের শুরুর আকাশ, তার রং, আলাপ হতে থাকলো দিন শুরুর সেই ছন্দের সঙ্গে , ফুল এর রং দেখে দেখে একসময় সে রং চিনতে শিখে গেলো, লাল, নীল, সাদা, হলুদ, পার্পল, শিখে গেলো গাছের পাতার সবুজ। দেখলো আবার সেই পাতার রং কেমন পরিবর্তন হতে থাকে। কিছুটা হাঁটার পরে, পাহাড়ি জঙ্গল এর একটা trail বা হাঁটা পথ এর বাঁক আসে যেখান থেকে জঙ্গল এর শুরু হয়, আমরা সেই বেঁকে যাওয়া পথ টাতে গিয়ে দাঁড়াই। ফিসফিস করে বলি তাকে জঙ্গল এর কথা শোনো, feel the silence . কে বলেছে ছোট রা কিছু বোঝেনা, তাদের কে সবকিছু বোকা বোকা করে বলতে হয়। কখনো না। ওদের কে বুঝিয়ে বললে ওরা ওদের মতন করে সবটা বোঝে। এখন ওই ছোট্ট মানুষটাই আমাকে ডেকে তার আধো আধো কথাতে বলে 'দেখো দেখো আকাশটা কি সুন্দর'। সূর্য্য ওঠা বা তার অস্ত যাওয়া দেখে আমরা একসঙ্গে খুশিতে নেচে উঠি। জঙ্গল এর রাস্তার অনেক আগে থেকেই সে বলে, 'জলগন জলগন'।
![]() |
ওই রাস্তাটাতে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মুখে চুপ করার ভঙ্গী করে বলে, 'পাখি', অর্থাৎ চুপ, পাখির ডাক শোনো। এখন আর তাকে আমায় 'চুপ করে জঙ্গল কে শোনো' বলতে হয়না। এইটুকু একটা অসম্ভব দুরন্ত বাচ্চা নিজে থেকেই কেমন শান্ত হয়ে কিছুক্ষন চুপ করে থাকে। দিন শুরুর আগে ওই একটুখানি সময় এখন আমাদের সত্যি সত্যি meditating pause হয়ে গেছে। ফুলকে দেখে , গাছ কে দেখে সেও আর পাঁচটা বাচ্ছার মতন ই তাকে ছিঁড়তে গেছিলো, কিন্তু যখন শেখালাম গাছের কষ্ট হয়, ফুলকে আদর করতে হয়, বারবার প্রতিদিন করতে করতে কিছুদিন পরে সে ফুলকে আদর করলো, পাতা কে আদর করলো। তাকে না ছিঁড়ে আমার দিকে দুষ্টু দুষ্টু মুখ করে তাকিয়ে বললো, গাছ ভালো। আর আমার বুক থেকে একটা স্বস্তির শ্বাস বেড়িয়ে এলো। আমার screentime ফ্রি ছোট্ট আড়াই এখন নিজেই গাছে জল দেয়।
এভাবেই ছোট্ট ছোট্ট জয় আমার প্রতিদিন কে ভরিয়ে রাখছে। এ এক অন্যরকম পথ চলা। এখন বুঝি শুধু বাবা মা হয়ে গেলেই প্যারেন্টিং হয়না, প্যারেন্টিং মানে আসলে একটা ছোট্ট শিশুকে বড় করা নয়, প্যারেন্টিং মানে নিজেরাও একটু একটু করে বড় হওয়া, পরিণত হওয়া, নিজেদের কে আরো শান্ত, স্থিত করা, patience এর পরীক্ষা, ইমোশনাল রেগুলেশন করা, কত gracefully আর কত beutifully একটা ছোট্ট প্রাণকে আমরা এই পৃথিবীকে চেনাতে পারি, how gracefully this universe could be unfolded in front a little heart তার টেস্ট। একদিন তো কখন বড় হয়ে যাবে, আর এমন গোটা ঘর জুড়ে খেলনা পরে থাকবেনা, থাকবেনা সব কিছু নিয়ে ব্যালকনি থেকে ফেলে দেওয়ার অভ্যেস, সকালের যুদ্ধ, জামা পড়া থেকে দাঁত মাজা সবেতাই গলদঘর্ম হয়ে যাওয়া, বা খাওয়াতে গিয়ে কখন প্রচন্ড খিদে জল হয়ে গিয়ে পেট ভরে যাওয়া। চিৎকার, কান্না, কোলে নিয়ে সব কিছু করা, এসব কিছুই থাকবেনা একদিন। শান্ত হয়ে যাবে সব ঘর গুলো। ছোট্ট ছোট্ট পা বড় হয়ে প্রবেশ করবে নিজের জগতে। সেই জগৎ ক্রমশ প্রসারিত হবে, তখন তাতে যেন আমার মনখারাপ না হয়, যেন আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করতে পারি সেই বড় হয়ে যাওয়াকে। আমার ওই তখনকার Gen বিটা এর থেকে যেন এই Gen Y কিছু শিখে নিতে কুন্ঠা বোধ না করে। জীবনের অর্ধেক বা তার ও বেশি পথ পেরিয়ে এসে আজকের দিনে এটুকু বুঝতে শিখেছি যে জীবনে সময় খুব কম। আমাদের চারপাশে অনেক মানুষ থাকতে পারে কিন্তু কানেক্টেড থাকি আমরা সেই গুটি কয়েক মানুষের সঙ্গেই যাদের সঙ্গে একসাথে আমরা মুহূর্ত তৈরি করতে পেরেছি। আর নিজের সন্তান কেই যদি সেই বৃত্তের বাইরে রাখতে হয় তবে বোধহয় সে জীবন ই ব্যর্থ। আমি চাই এই ছোট্ট মানুষটার সঙ্গে মুহূর্ত তৈরি করতে। তাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে গিয়ে কর্তব্যের কঠোর ফাঁদে নয়, প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত তার সঙ্গে যেন নতুন ভাবে বেঁচে উঠতে পারি। আমার সন্তানের সঙ্গে আমি, যুক্ত নয় তার সঙ্গে যেন কানেক্টেড থাকতে পারি।
ইদানিং সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে দু ধরনের পোস্ট দেখতে পাই একদল মাতৃত্বকে অত্যন্ত glorify করতে গিয়ে প্রায় গর্ভের মধ্যে ঢুকে পড়ে এবং তারপরে বাচ্চার চান, পটি, বেড়ে ওঠার পুঙ্খানুপুঙ্খ সব ই সোশ্যাল মিডিয়া তে উঠে আসে আর এক ধরনের পোস্ট থাকে যা আদ্যোপান্ত চেষ্টা করে সন্তানের অযোগ্যতা প্রমাণ করাতে, মা বাবা কে দেখেনা, বৃদ্ধাশ্রম ইত্যাদি হলো সেখানের আলোচ্য। আমি বিচারক নোই , দ্রষ্টা মাত্র । কোনো কিছু দেখে ভালো না লাগলে সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে চলে গিয়ে ভালো লাগার বিষয় খুঁজে নি। এমন এক জেনারেশন এ জন্ম আমার যেখানে পিটিয়ে মানুষ করায় বিশ্বাসী মানুষজন কেও দেখেছি যেখানে যে যত কঠোর সে মনে করে মাতৃত্ব/ পিতৃত্বের মাপকাঠিতে তার স্থান তত ওপরে আবার অতিরিক্ত আদরে উচ্ছন্নে পাঠানো মা বাবাকেও দেখেছি। আমার কোনো বক্তব্য নেই এ ব্যাপারে। যেমন নেই ওই সোশ্যাল পোস্ট এর ব্যাপারে। আমি নিজে একটু প্রাইভেট মানুষ, ব্যক্তিগত জীবনকে একদম খোলা বই এর মতন প্রকাশ করতে পছন্দ না করা, একজন মেয়ে এবং কিছুদিন যাবৎ মাতৃত্বের পথে পা রাখা একজন। প্যারেন্টিং কোনো প্রতিযোগিতা নয়, তুলনারও নয়। পদ্ধতি আলাদা হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি মা-বাবার লক্ষ্য এক—নিজের সন্তানকে ভালোবাসা, যত্ন আর নিজের সেরাটা দিয়ে বড় করে তোলা। তবু কোথাও গিয়ে মনে হয় ওই ভীষণ দুই চরম ও নরম পন্থীর বাইরে গিয়েও কিছু যেন একটা আলাদা পথ আছে, হয়তো তার রূপ টা আমার কাছে পরিষ্কার নয়। কিন্তু এটুকু জানি আমাদের গবেষণার মতন এও এক সাধনা। কোনো একদিন হটাৎ করে আমার মনে হবে আমার হাতে অবসর এসেছে, এখন আমার সন্তান যেন আমার বন্ধু হয়ে ওঠে, অথচ তার ধ্যান ধারণা সব ই নিন্দনীয় আমার কাছে , এ হয়না। শ্রদ্ধা ভীষণ পারস্পরিক।
ম্যানহাটান এমন এক জায়গা যেদিকে গোটা পৃথিবী তাকিয়ে থাকে। সেই শহর এর টপ tier হসপিটাল এ যার জন্ম সে যে জন্মের আগে থেকেই এডভান্সমেন্ট পেয়ে বড় হচ্ছে বা হবেও সে কথা বলাই বাহুল্য। তাই এডভান্সমেন্ট,টেকনোলজি, খেলনা , জামাকাপড় এসব কিছু নয়, এই ছোট্ট মানুষটাকে মাটিতে পা দিয়ে মানুষের মতন বড় হতে গেলে যা দরকার, তা হয়তো প্রকৃতি হয়তো তাই প্রকৃতিকেই সেতু করেছি। এই প্রকৃতি দিয়েই হয়তো একদিন ও শিখবে বিজ্ঞানের কেনকে যা আবার উপনিষদের কে এর ও উত্তর দেবে । খুঁজছি কি তার ওপরে নির্ভর করে কি পাবো 😊 বসে ফোন বা টিভি এর দরকার পড়েনি এখনো, মার্কিনী মুলুকে বসেও দিদুন এর দেওয়া সমস্ত বাংলা বই এর ছবি ছড়া গল্প ই তার ভীষণ প্রিয় সঙ্গী। Cognitive neuroscience-এর এত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে জানি—মাতৃভাষাকে সরিয়ে শুধুই ‘কাজের ভাষা’ শিশুর মনে ঢুকিয়ে দেওয়ার মধ্যে আলাদা কোনো লাভ নেই। বরং ভাষা ও পৃথিবীকে যত স্বাভাবিকভাবে তার সামনে আসতে দেওয়া যায়, তত সহজেই সে সবকিছুকে আপন করে নিতে শেখে।নিজের জানা এর বাস্তব প্রতিফলন দেখি যখন ছোট্ট মানুষটা গাছের পাতা হাতে নিয়ে বলে পাতা, leaf এক ই এক ই , ফল fruits এক ই এক ই। অবাক হয়ে দেখি কখন নিজেই বুঝে নিয়েছে বাড়িতে কাঠবেড়ালি বলতে হবে আর বাইরে অন্যদের squirel না বললে তারা বুঝবেনা। অথচ এই শেখাটা এতটাই স্বাভাবিক যে, সে নিজেও জানে না কী অসাধারণ একটা কাজ সে করে চলেছে। পারতপক্ষে ওর সঙ্গে তাই ইংরাজি তে কথা বলিনা।
আমি চাই না পৃথিবীকে তার কাছে ভয়ংকর বা কঠিন কোনো জায়গা হিসেবে তুলে ধরতে।চাই সে প্রথমে পৃথিবীকে সুন্দর, সাবলীল , স্বচ্ছন্দ ভাবে চিনুক ভয় নয়, বিস্ময় আর কৌতূহল নিয়ে ওর সমস্ত সত্বা নির্ভয়ে বিকশিত হোক। ওর মতন করে। “Children are not things to be molded, but are people to be unfolded.” — Jess Lair
জীবনের এতটা পথ এ কত মানুষের সঙ্গে আলাপ, অভিজ্ঞতার ঝুলিও নেহাত কম নয়, কতজন কে দেখলাম সম্পদের মোহে, ফ্যাশন দুনিয়াত হারিয়ে যেতে, কতজন কে দেখলাম, চোখ আছে, কিন্তু তাতে কোনো দৃশ্যপট নেই, রীল এর দুনিয়াতে কখন real ওয়ার্ল্ড শেষ। এই ছোট্ট মানুষটা এর চোখ এ সেই দৃষ্টি তৈরি হবে কিনা আমি জানিনা, কিন্তু দৃষ্টিপট যেন এনে দিতে পারি। একটা ছোট্ট মানুষকে বড় করতে গিয়ে কি কি স্যাক্রিফাইস করলাম, কি কষ্ট করলাম , কোন রেস্টুরেন্ট এ খাওয়ালাম বা কি কি দিয়ে তাকে বড় করলাম এসবের কিছুই পরে থাকবেনা, থাকবে শুধু তাকে আমরা কিভাবে ভালোবাসলাম, কি কি মূল্যবোধ তার মধ্যে দিতে পারলাম আর কি কি সুন্দর মুহূর্ত তৈরি করতে পারলাম। সময় চলে যাবেই, কিন্তু যে সময় টা সঙ্গে আছি সেটুকু সময় যেন জড়িয়ে থাকতে পারি। যাকে এখন আমি শেখাচ্ছি একদিন যেন তার কাছে শিশুর মতন আমি শিখতে পারি। ওর প্রশ্ন এখন যেমন আমাকে আনন্দ দেয় পরেও যেন তেমনি ভাবেই ওর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারি। অনেক বছর পরে সেদিন ও আজকের মতন এই ছোট্ট মানুষটা যেন বলতে পারে দেখো মা আকাশটা কি সুন্দর। physical distance যদি থাকেও তা যেন আমাদের কাছাকাছি হতে বাধা না দেয়।
হয়তো এটাই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর যাত্রা—সন্তানকে বড় করতে করতে, নিজে প্রতিদিন একটু একটু করে পরিণত হয়ে ওঠা।এইভাবেই প্রতিটা দিন যেন আগের আমির চোখে একজন বেটার মা, সর্বোপরি একজন বেটার মানুষ হয়ে এসে ধরা দেয় । আমার আজকের আমির চোখের দিকে যেন গতকালের আমি গর্ব নিয়ে মুচকি হেসে তাকাতে পারে, আজকের আমি আগামীর আমির দিকে। “Life isn’t about finding yourself. Life is about creating yourself.” — George Bernard Shaw

