এবছরের মতন দেবী দূর্গা ফিরে গেছেন কৈলাশে। অস্তমিত হয়েছে কোজাগরীর চাঁদ ও । দূর্গা পুজো আসলে মা মেয়ের গল্প , মেয়ের তার মা এর কাছে ফিরে আসা। আর এই স্বর্গ ও মর্ত্যলোকের কল্পনা কেমন যেন আমায় মনে করায় মা বাবাদের সেই চিরন্তন চাওয়া আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাত এ। মা বাবার কোল থেকে বড় হয়ে বৃহত্তর জগতে পদার্পন করে সন্তান যেখানে তার মতন করে তার জগৎ সংসার সামলাচ্ছেন কিন্তু মনের মধ্যে রাখা ছোট্টবেলার বেড়ে ওঠা গুলো ভীষণ যত্নে, ভীষণ আদোরে লালিত , দশদিক সামলিয়ে সবাইকে নিয়ে সেই ছোটবেলার চৌকাঠে পা রাখা বারবার। কিন্তু সবসময় সবার এই সৌভাগ্য হয়না, সৌভাগ্য হয়না আর পাঁচ জনের মতোনা বেড়ে ওঠার বা এক ই ভাবে ফিরে যাবার, মায়ের বুকে বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ার। অনেকসময় কতজনে তাদের সান্নিধ্যে বড় হবার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়। এই পৃথিবী এক অদ্ভুত জায়গা। এখানে মানুষ নিজের কর্মে নিজের জায়গা তৈরি করে কিন্তু কোথাও সে বাঁধা থাকে অদৃষ্টের অদৃশ্য বন্ধনে। অদৃষ্টের সুতোয় কোথাও সে নীরবে , অদৃশ্যে নিয়ন্ত্রিত হয়ে চলে। কর্ম , কর্ম তো করতেই হবে। কর্মের জোড়েই আমরা নিজেরা নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যাই। অদৃষ্ট আর কর্ম এর সংযোগ হলে হয়তো এমন কিছু ঘটে যা আপাত দৃষ্টিতে আমাদের মিরাকেল বলে মনে হয়। আজ শুনবো এমন ই এক অভাবনীয় ঘটনার। সত্যি ঘটনার কথা। শুনি রুথ লি এর কথা, রুথ লি, একজন ৭০ বছর বয়সী ভীষণ ই accomplished এক জন মানুষ। এক মা। ছোটবেলায় তিনি জানতেন যে তিনি দত্তক নেওয়া হয়েছেন, কিন্তু তা কখনোই কোনো আক্ষেপের কারণ হয়নি, দত্তক মা বাবার স্নেহে, তিন ভাই বোনের সঙ্গে আনন্দের সঙ্গে কেটেছে শৈশব, কৈশোর, যৌবন। বিয়ে করেছেন, এক একটি করে ৬ সন্তান এসেছে জীবনে। তারা প্রতিষ্টিত হয়েছেন জীবনে, তারা যেন এক একটি রত্ন, একজন আর্মিতে কর্নেল, একজন নাসার মহাকাশচারী হিসেবে চারটি মহাকাশ অভিযানে অংশ নিয়েছেন। বাকি সন্তানরাও নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মা এর সম্পর্ক ও ভীষণ সুন্দর। একজন মানুষের জীবনে আর কিছু কি চাওয়ার থাকতে পারে ? রুথ এর ও ছিলোনা, এত সুখী, সার্থক এক জীবনে কখনো নিজের সেই না দেখা জীবন তাঁর আসল মা বাবার খোঁজ নেবার তাগিদ কখনো অনুভব করেননি তিনি। কিন্তু ৭০ পেরোনোর পরে যখন একের পর এক অসুখ এসে হাসপাতাল আর বাড়ি করতে করতে তাঁর জীবন যখন একেবারে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, প্রাণ নিয়ে টানা পোড়েন তখন ডাক্তার রা বললেন, জেনেটিক সমস্যা হতে পারে, ভালো করে বুঝতে হলে আসল মা বাবার মেডিকেল হিস্ট্রি জানা দরকার। এডোপটেশন এর কাগজপত্র সন্তানকে দেখানোর নিয়ম থাকেনা, কিন্তু মেডিকেল গ্রাউন্ড এ আর্জি জানালে কিছু হতে পারে, রুথ এর একদম ইচ্ছে ছিলোনা আবার এই বয়সে এসে এত হাঙ্গামা করেন। কিন্তু ছেলেমেয়েরা কিছুতেই শোনেনা, তাদের জোরাজুরি তে অবশেষে অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাধ্য হয় রুথকে মেডিক্যাল গ্রাউন্ডে পিটিশন ফাইল করতে হল সরকারি অফিসে, যাতে তার অ্যাডাপশনের পেপার পাঠানো হয়। প্রত্যাশা ছিল না, ইচ্ছেও নয়! এলে আসবে! না এলে রুথের বয়েই গেছে! সেই তো পাঁচ পাতার ডকুমেন্টস!
এমনই এক অভিবাসী পরিবারে জন্ম মিনকার। ছোটবেলায় তারও ইচ্ছে ছিল স্কুলে পড়াশোনা করার, কিন্তু সংসার আর খামারের কাজের প্রয়োজনে বেশিদিন সেই সুযোগ পায়নি সে। পরিবারের কাজে হাত লাগাতে গিয়ে অল্প বয়সেই পড়াশোনায় ইতি টানতে হয় তাকে।
মাত্র ষোলো বছর বয়সে মিনকার জীবন যেন বাঁধা পড়ে গিয়েছিল খামারের দৈনন্দিন রুটিনে। সকাল থেকে সন্ধ্যা—কাজ আর দায়িত্বের বাইরে আলাদা করে নিজের জন্য সময় বলতে বিশেষ কিছুই ছিল না। তবে দুপুরের একটা ছোট্ট সময় ছিল একান্ত তার নিজের। সেই সময়টুকুতে বান্ধবীদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ত সে, কখনও বনের পথে হাঁটত, কখনও গাছপালায় ঘেরা নির্জন জায়গায় বসে গল্প করত।
বয়ঃসন্ধির সেই দিনগুলোতে বাস্তবের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মনে কত রকমের স্বপ্ন যে ভিড় করে আসে! এমন সব স্বপ্ন, যেগুলোকে হয়তো নিজেরাই অসম্ভব বলে জানি, অথচ মন থেকে সরিয়ে রাখতে পারি না। অজানা ভবিষ্যতের প্রতি কৌতূহল, অন্য রকম জীবনের আকাঙ্ক্ষা, আর একদিন নিজের মতো করে বাঁচার ইচ্ছে—এসবই ঘুরেফিরে আসত তাদের কথায়।
দুপুরের সেই অল্প সময়টুকুতে বান্ধবীদের সঙ্গে মনের কথা ভাগ করে নিত মিনকা। খামারের চারপাশে সীমাবদ্ধ জীবন থেকে দূরে, সেই মুহূর্তগুলোতেই যেন সে একটু অন্য রকম পৃথিবীর স্বাদ পেত। কিন্তু সে তখনও জানত না, সামনে এমন এক সময় অপেক্ষা করছে, যা তার কিশোরী জীবনের সমস্ত পরিচিত হিসেব বদলে দেবে। এমন ই দুপুরে একদিন হটাৎ করে মিনকা আর তার বান্ধবী শিকার হয় তিনজন পুরুষের লোভের। কিশোরী জীবনের সেই নরম সুন্দর স্বপ্ন গুলোকে এক নিমেষে ভেঙে চুরমার করে দেবার জন্যেই যেন তাদের কাছে এসেছিলো কাউবয় টুপি পড়া কিছু অমানুষ, ভালো করে মুখ ও দেখতে পায়নি তাদের ওরা আর সন্ধ্যে বেলায় বাড়ি ফিরে নিজেদের জীবন তছনছ হয়ে যাবার এই ঘটনাও কাউকে বলতে পারেনি। তাছাড়া বলবেই বা কাকে, চিরকাল ই সমাজে এমন ঘটনায় মেয়েদের সহানুভূতির থেকে দোষারোপ ই শুনতে হয় বেশি, আর সেই সময়কাল যখন শতাব্দী আগের, তখন যে একথা বলা কতটা কঠিন তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। কিন্তু বেশিদিন চুপ করে থাকতেও পারেনি সে, গর্ভলক্ষন দেখা দিতেই বাড়ি, পারিপার্শিক, মা সবার প্রশ্নবানে জর্জরিত সেই ষোলো বছরের কিশোরী তার জীবনের সবথেকে কালো দুপুরের কথা বলতে বাধ্য হয়। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে, abortion এর আর সুযোগ নেই, উপায়ান্তর না দেখে অসহায় পরিবারটি তখন দ্বারস্থ হয় লুথেরান চার্চ এর, যদি কেউ জন্মানোর পরে সেই নবাগত সন্তান কে দত্তক নিতে রাজি হন। চার্চের হাউস অফ মার্সি সংগঠনের মাধ্যমে এক সহৃদয় ধর্মযাজক ও তাঁর স্ত্রী সেই নবাগত কে দত্তক নিতে রাজি হলেন। মিনকার বয়স তখন সতেরো। পরিবারের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ ছিল না।
এক অপেক্ষার, পুনর্মিলনের। ডেডিকেশন , কমিটমেন্ট এর। মিরাকেল এর মতন। আশ্চর্য্য হয়ে যাই যা চিন্তা করলে, অভাবনীয় হয়ে অবাক হয়ে ভাবি, এমন ঘটনা ও হয়, আর যার সঙ্গে সেই ঘটনা হয়, সে কি ভাবে? তার ভাগ্য তো সত্যি ই নিয়ন্ত্রিত হয় অদৃষ্ট বলুন , ঈশ্বর বলুন, অদৃশ্য কোনো শক্তি যাই হোক সে, যে রূপেই মানুষ তাকে গ্রহণ করুক, তার অদৃশ্য চালনে , আমরা জানতেও পারিনা। আজ শুনবো এমন ই এক অভাবনীয় ঘটনা, যেখানে অদৃষ্টের অদৃশ্য চালনা অজানা ছিল, কিন্তু ভালোবাসা, কমিটমেন্ট আর এক ই কাজের প্রতি লেগে থাকা ডেডিকেশন কিভাবে সন্তানকে তার জন্মদাত্রী এর সঙ্গে মিলিয়ে দিতে পারে। ৭৭ বছর পরে ফিরে পাওয়ার এক অনন্য ঘটনা। cathey Lagro এর লেখা The Waiting বই এর থেকে নেওয়া সত্যি ঘটনা।


