Thursday, 23 July 2026

তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর, এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা

ঘটনার পরে ঘটনা। এক একটি করে ঘটনা ঘটে, প্রতিবাদএর ঝড় ওঠে, ফেইসবুক এ লেখালিখি, মোমবাতি নিয়ে হাঁটাহাঁটি। তারপরে, আবার সব থেমে যায়। আমরাও নিজেদের নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। প্রশাসন ও বুঝে গেছে আজ যারা চিৎকার করছে কাল তারা থেমে যাবে। এদের প্রতিবাদ কে ইগনোর করে থাকা যায়। একজন সোনাম ওয়াংচুক মারা গেলে কি আর এমন হবে? কিছুই হবেনা। অশিক্ষা যেখানে চারিদিকের আকাশ কালো মেঘে ঢেকে দিয়েছে, সেখানে দিনের পর দিন তার তলায় থাকতে থাকতে ওই কালো মেঘ কেই সত্যি মনে হবে আর নীল আকাশ কে মনে হবে স্বপ্ন। আমরা নিউস চ্যানেল এ দেখবো এইরকম একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব চলে যাচ্ছেন, আমরা দেখবো আর তারপরে আবার স্ক্রল করে অন্য কোনো খবরে চলে যাবো। আমাদের বাড়ির ছেলে তো আর NEET পরীক্ষার জন্যে মাথার ঘাম পায়ে ফেলছেনা ? একটার পর একটা পরীক্ষা বাতিলে ডিপ্রেশন এ চলে যাচ্ছেনা। তাহলে আমাদের আর কি।আমাদের কি বা করার আছে। আসলে ভেতর থেকে বদল না এলে কিছু হয়না। কিন্তু আজ্কের ভারতবর্ষ এর জনবিক্ষোভের চিত্র যেন সদম্ভে ঘোষনা করছে সেই সময় এর আর বেশি দেরি নেই। আজকের ভারতবর্ষ এর যুবসমাজ, শুভ চেতনা সম্পন্ন মানুষ যেন সগর্বে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করছে। কত আইন করবে? কত লাঠিচার্জ করবে? বহুদিনের বহু ঘটনা, বহু চাপা দেওয়া পুঞ্জীভূত ক্রোধ একসঙ্গে বেরিয়ে আসছে।
একজন বিজ্ঞানীকে urgent medical care দেবার নাম করে illegally ডিটেনশন করানো হচ্ছে, কি মনে করে করানো হচ্ছে? যাতে ওই আন্দোলনের মেরুদন্ড ভেঙে দেওয়া যায়। you moron । সমাজ চিরকাল একরকম থাকেনা। এই সমাজেই এককালে সতীদাহ প্রথা ছিল। একদিনে বন্ধ হয়নি তা। বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয়ে যাবার পরেও বিদ্যাসাগর মহাশয় কে ইঁট ছুঁড়ে মারা হয়েছিল। আমাদের সেই তলিয়ে যাওয়া সমাজ টাকে কিছু মানুষ নিজেদের চেতনার আলোতে অন্ধকার থেকে টেনে বার করে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন একসময়। সক্ষম হয়েছিলেন অন্ধকার থেকে নবজাগরণের পথে আনতে। কিন্তু তারপরে বহু বছর ধরে ধীরে ধীরে আবার এই সমাজ পিছন দিকে হাঁটতে শুরু করেছিল। রাজনৈতিক দল এসেছে গেছে, সবাই কম বেশি সেই ঘুন ধরা কাঠামোতেই আরো ঘুনপোকা বুনেছে। যন্তরমন্তর এর সামনে থাকা ওই ছেলে মেয়ে গুলোর ইচ্ছেশক্তি যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আর বেশি দেরি নেই সেই জীর্ণতার ভেঙে পড়ার।
এই যুবসমাজ কেই আজকাল এদের দ্বারা কিস্যু হবেনা গোছের মন্তব্য করে থাকেন না একদল অতি ইন্টেলেকচুয়াল কিছু মানুষ! হ্যাঁ এই সেই কিস্যু হবেনা সমাজ , যাদের রীল এর দুনিয়া অন্ধ করে রাখতো। কারণ ছোট থেকেই বহু বাড়িতে বাচ্ছারা যখন বড় হয় , প্রত্যেক কথাতে আমরা তাদের শেখাই , প্রশ্ন করোনা। প্রশ্ন করলে মানেই তুমি অভদ্র, অবাধ্য। আর বড় হয়ে, পড়াশুনো করে, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যদি প্রশ্ন করো সঙ্গে সঙ্গে তোমাকে মনে করিয়ে দেওয়া হবে, "বিদ্যা দদাতি বিনয়ম", তুমি প্রশ্ন করলে মানে তুমি এক প্রচন্ড দুর্বিনীত ও অহংকারী মানুষ। অথচ ওই শ্লোকের সঙ্গে সঙ্গেই কেউ ভগবত গীতার সেই শ্লোক এর কথা তো বলেনা ? যা প্রশ্ন করতে শেখায়, প্রশ্ন করার কথা বলে, "তদ্ বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া। উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্তত্ত্বদর্শিনঃ॥ "
একসময় যে জেনারেশন কে আমরা প্রশ্ন করাকে অপরাধ করা মনে করিয়ে বড় করেছি এখন তাদের একাংশ যে সমস্ত প্রশ্ন করা থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে নিয়ে শুধু মাত্র reels এর দুনিয়া তে মুখ ডুবিয়ে থাকবে এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। আর বৃহত্তর ক্ষেত্রে তাতে সুবিধে পেয়েছে কিছু মানুষ। ওই যে সেই হীরক রাজার দেশের মতন, "এরা যত বেশি জানে, তত কম মানে"। আসলে শিক্ষার কথা আমরা মুখে বলি মাত্র, কিন্তু কজন প্রকৃত শিক্ষার কদর করি? এখনো , অনেক জায়গাতেই তোমার শিক্ষার কিয়ৎ অংশ জ্ঞান থেকে যদি তোমার চেনা পরিচিত দের কোনো সমস্যার সমাধান দাও তাহলে তোমাকে শুনতে হয় "অনেক বেশি জেনে গেছিস।" "খুব জ্ঞান দিছিস " অর্থাৎ শিক্ষা গ্রহণ করা সম্মানের, কিন্তু সেই শিক্ষাকে কাজে লাগানো অনেকের কাছে বিরক্তিকর। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো—অনেক সময় সেই মানুষদের কাছ থেকেই আমাদের পুঁথিগত শিক্ষা ও ব্যবহারিক জ্ঞান নিয়ে উপদেশ শুনতে হয়, যারা নিজেরাই প্রশ্ন, যুক্তি ও নতুন চিন্তার সবচেয়ে বড় অন্তরায়। তাই জন্যেই সোনাম ওয়াংচুক এর মতন মানুষকে অনশন এর পথ বেছে নিতে হয়। তাই জন্যেই তাঁর গণতান্ত্রিক অধিকার কে তুচ্ছ করে তাঁর মতন সম্মানীয় মানুষকে ঐভাবে তুলে নিয়ে যাবার সাহস দেখানো যেতে পারে। কিন্তু কত আটকাবে? প্রলয় কে আটকানো যায়না। দীর্ঘদিন , বছর ধরে অনেক কিছু ঘটছে। একটার পর একটা ঘটনা , ঘটেই চলেছে , নির্ভয়া, অভয়া , বারুইপুর ঘটনা। ঘটেই চলেছে । রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুড়ি শুরু হয়ে যায় প্রতি ঘটনার পরে। আইন ভাঙা হয়, গড়া হয়, এদল আসে, সে দল যায়, কিছুই হয়না। কিছুই না। কি মনে হচ্ছে? ধর্ষণ আর এই আন্দোলন দুটি ভিন্নবিষয় ? আমার লেখায় আমি গুলিয়ে এক করে ফেলছি? একেবারেই না। আলাদা তাকে আমরা newschannel এর হেডিং এ করতেই পারি কিন্তু দ্রোণ ক্যামেরা দিয়ে কিছুটা ওপরে উঠে গিয়ে যদি ফ্ল্যাশব্যাক এ একটার পর একটা ঘটনাকে পরপর দেখা যায়, একটাই কথা উঠে আসে, অশিক্ষা।।
প্রতিদিনের সমাজে আমরা যে ভয়ঙ্কর ঘটনার শিকার হচ্ছি তার আসল ভীত সেখানেই লুকিয়ে। ছেলে মেয়ে এর মধ্যে প্রচন্ড বৈপরীত্য এর ভাবনা অশিক্ষা না থাকলে আসেনা। মেয়েদের ওপরে প্রচন্ড ঘৃণা ও দমন করার ইচ্ছে না থাকলে ধর্ষণের মতন ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেনা। এখনো আর আগের মতন হয়তো ছেলে মেয়েকে আর আলাদা করে মানুষ করেনা। মেয়েদের কেও সমান সুযোগ দেওয়া হয় ঠিক ই। কিন্তু দৃষ্টি পার্থক্য চলে যায়নি। এখনো অনেক টিনএজ মেয়েকেই যখন সম বয়সের কোনো ছেলে প্রেমপত্র লেখে, তখন অনেক বড় পর্যন্ত ও তাকে সেই নিয়ে কথা শুনতে হয়। দোষ তো মেয়েদের ই তাই না? তারাই কোনোভাবে প্ররোচিত করেছে, নাহলে কি এমন হয়। ধর্ষণ এর মতন বিকৃত ঘটনার জন্যে দায়ী কি শুধুই যারা এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত? না। এর জন্যে দায়ী আমরা সবাই যারা মনে করি, মেয়েদের ছোট জামা কাপড়ের জন্যেই মেয়েরা বিপদ ডেকে আনছে। রাত করে বাড়ি ফিরলো কেন। কোনো মেয়ে একা ঘুরতে গেছে শুনে আমরা যারা এখনো আকাশ থেকে পড়ি। মেয়েরা সোলো ট্রিপ এ যাচ্ছে, বাইরে হোটেল এ থাকছে শুনেই আমরা যারা চোখ গোল করে অন্য মানে খুঁজতে শুরু করে দি, আমরা এখনো যারা মনে করি মেয়ে মানেই তার কোনো ব্যক্তি স্বাধীনতা থাকবেনা, সে বাধ্য কোথায় যাচ্ছে, কি করছে এর প্রতিটা নাড়ীনক্ষত্রের হিসেব নিকেশ বাড়ির লোকেদের দিতে, মেয়ে মানেই যখন তখন তার ব্যক্তিগত স্পেস এ ঢুকে পড়া যাবে, সেই প্রতিটা মানুষ। এখনো ওই আন্দোলন এর বিভিন্ন পোস্ট এর নিচে দেখতে পাচ্ছি "কি মজা ছেলে মেয়ে সবাই মিলে বেশ এক আকাশের নিচে থাকা হচ্ছে ", "এরা নীট এর বানান জানে?" বা "বা বন্ধু বান্ধব মিলে কদিন তো বেশ মজা হচ্ছে, বেশ ক্লাস করতে হচ্ছেনা " এই ধরণের মন্তব্য। এই ধরণের মন্তব্য যারা করছেন তারা কিন্তু বয়স্ক। হয়তো ষাটোর্ধ। পড়ে মনে করতে যাচ্ছিলাম এরা মানুষ ! তারপরেই মনে হলো, বটেই তো। সমাজে এই চিন্তা ভাবনা নিয়ে এখনো কিছু মানুষ আছে বলেই তো এই সব সামাজিক ব্যাধি। আইন করে, শাস্তি দিয়ে, মানুষের অপরাধ প্রবণতা বন্ধ করা যায়না। তোমার মন ; তুমি তাকে নিয়ে পাঁকে নিমজ্জিত হবে নাকি সেই পাঁকে পদ্ম ফুল ফোটাবে সে একান্তই তোমার ব্যক্তিগত অভিরুচি। কিন্তু সেই অভিরুচি দিয়ে collectively একটু একটু করে আর পুরো সমাজের পচন ধরানো বোধয় যাবেনা। এখনো ওই তরুণ রক্তের একটা বড় অংশ প্রশ্ন করতে জানে। নিজেদের শিক্ষার জন্যে, নিজেদের অধিকারের জন্যে নিজেরা লড়াই করতে জানে। কোনো রাজনৈতিক ছত্রছায়া আশ্রয় ছাড়াই তা করতে পারে। এখনো তাদের কে নিয়ে ভাববার জন্যে প্রাজ্ঞ মানুষেরা আছেন। স্যালুট ,মনে হচ্ছে এই প্রজন্ম এবার সত্যি শিক্ষিত সাহসী | নিজের কাছে সৎ থাকলে যে কোনো লাঠি র সামনে দাঁড়ানো যায় | সংহতি এই আন্দোলনের সঙ্গে। দূরে থেকেও পাশে রইলাম।
“এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা"...
note: এই লেখা রাজনৈতিক নয়। দয়া করে এর সঙ্গে রাজনৈতিক রাজনৈতিক পক্ষ পাতিত্ব খুঁজতে যাবেননা। একজন responsible ও শিক্ষিত মানুষ হিসেবে যদি এই আন্দোলন কে সমর্থন না করি, তাহলে নিজের কাছেই লজ্জা পেতে হবে। এই লেখা ভেতরের সেই তাগিদ থেকে।

তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর, এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা

ঘটনার পরে ঘটনা। এক একটি করে ঘটনা ঘটে, প্রতিবাদএর ঝড় ওঠে, ফেইসবুক এ লেখালিখি, মোমবাতি নিয়ে হাঁটাহাঁটি। তারপরে, আবার সব থেমে যায়। আমরাও নিজ...