Friday, 19 July 2019

বদলে যাওয়া পৃথিবীতে থমকে যাওয়া আমি
আমার বৃষ্টিস্নাত স্নিগ্ধ বেলায়
কেন বিষন্ন বনভূমি
মেঘলা আকাশ, বৃষ্টি, ভেজা হাওয়ায়
বাণিহারা সবকিছু
থাকনা নাহয়
উতল হওয়া মানা
তবু মনে আমার বেজেই চলে
"ও যে মানে না মানা ".......

শব্দের ভারে বাতাস হয়েছে ভারী
তাই আজ নাহয় লেখা হোক চুপকথা।
নাহয় কিছু স্তব্ধ মুহূর্তের, মৌনতায় ধরা দিক গভীরতা।
ধ্যানমগ্ন চারিদিক, মুখরিত নীরবতা।
আজ সব ছেড়ে দিও
শুধু প্রাণ পাক সঁপে দেওয়া সখ্যতা।।

ধ্যানমগ্ন পৃথিবীতে মুখর নীরবতা
মৌন হয়েই প্রাণ পাক শুধু সঁপে দেওয়া সখ্যতা 

Friday, 12 July 2019

বেহিসেবি সময় কখনো কখনো হিসেবি হয়ে ওঠে খুব। বিকেলবেলার পড়ন্ত রোদ টা যখন কাঁচের জানলা দিয়ে উঁকি মেরে যায়, আর মন না বসা মন কিছুতেই আর work desk এ বসে না থেকে আকণ্ঠ ডুবদিতে চায় পাশের সবুজ টাতে। ঠিক তখন আনমনে হাত হটাৎ না বলা মোবাইল তুলে নেয়। একসময় কথা ফুরোতোইনা। হোয়াটস্যাপ, এমনি msg , ঘন্টার পর ঘন্টা ফোন কল। তারপরেও মনে হতো কিছুই তো বলা হলোনা। যেন মনে হতো জন্ম জন্মান্তর ধরে জমে আছে কত না বলা কথা। তারপর হটাৎ করে বেহিসেবি সময় চোখে চশমা লাগিয়ে হিসেবের খাতা খুলে বসে। পাওয়া না পাওয়ার নিক্তি তে বিচার হয় সম্পর্ক। যত্নে লাগানো ফুলগাছ গুলোর মাঝখান গুলোতে হটাৎ একরাশ শূন্যস্থান। একসময় সেই শূন্যস্থান ভরাতে যত্ন নিতো ফুলের পাপড়ি, প্রজাপতির পাখারা। আজ সেখানে হটাৎ জন্মে যায় আগাছা। একেবারে ভর্তি হয়ে যায়। অঘ্রানের শিশির টুপটুপিয়ে পড়তে গিয়েও থমকে দাঁড়ায়, ও এখানে তাহলে আগাছার ই থাকার কথা ছিল। 
বাতাস ও বইতে গিয়েও ইতস্তত করে। যাবো কি যাবোনা। হটাৎ সবকিছুর মধ্যে থেকে সহজাত spontaneity নিয়েছে বিদায়।  বেহিসেবি মন ভয় পায়। আপন নিয়মে চলার গতি থমকে যায়। হিসেবের পাতায় মাপা হতে থাকে দিন রাত্রির কমা বাড়া। আদুরে রাত্রি হটাৎ মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে। বাধাহীন পথ ও আর অনন্ত হয়না, একটু এদিক থেকে ওদিকে গেলেই নেভিগেটর লেডি ও যান্ত্রিক গলায় বলে ওঠে, u have to take the right turn or ১০ mins to reach ur destination . বেহিসেবি পথ হিসেবি হয়েছে। 

Wednesday, 10 July 2019

আদর মাখা ছোটবেলাতে বিকেলবেলা গুলো আসতো ভীষণ মিষ্টি হয়ে। মা চুল টানটান করে দিয়ে দুপাশে দুটো ঝুঁটি বেঁধে দিতো। বাবা একদম একটা করে চুল বাঁধা পছন্দ করতোনা। কোঁকড়ানো চুলে দুটো করে চুল বাঁধলে ঠিক যেন ফুলের মতন থোকা হয়ে থাকে। চুল বাঁধা হয়ে গেলে মা কাজল পড়াতে চাইতো আর বাবা বলতো না কাজলে চোখ নষ্ট হয়ে যাবে। ফলত অনেক বড় বয়স পর্যন্তই আমি মায়ের হাতে ঘরে পাতা কাজল পড়েছি। আর য্খন actually মেয়েরা কাজল এমনকি eyeliner tiner ও কি জিনিস জেনে গেছে , তখন থেকে আর কাজল পড়াই হয়নি আমার। ফলে অভ্যেসটাই চলে গেছিলো কাজল পড়ার। 
চুল বেঁধে কখনো সাদা, কখনো নীল কখনো সেই প্রিয় লাল রঙের ফুলফুল ফ্রক পরে বাবার হাত ধরে আমি বেড়াতে বেরোতাম। দিদি বলতো ওই যে বেড়াতে চললেন মহারানী। আমি লাফিয়ে লাফিয়ে প্রথমেই যেতাম পাশের মাঠে, যেখানে বাদামি রঙের গরুটা বাঁধা থাকতো, সেখানে। তাকে খাওয়াতাম কচি বাঁশপাতা। আর ওর গলায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কি যে গল্প করতাম কিজানি। তারপরে আমাদের গন্তব্যস্থল হতো সামনের ছোট্ট কালভার্ট টা। সেখানে একদিক থেকে পাতা ভাসাতাম আর অন্য দিকে সেই পাতাটা ভেসে বেরোচ্ছে কিনা দৌড়ে দেখতে যেতাম। তারপরে সামনের মাঠ এ তে একটু বসে ফিরে আসা। এই ছিল আমার আর বাবার প্রাত্যহিক রুটিন। ক্লাস চেঞ্জ হয়, একটা একটা করে ধাপ বদলায়, কালভার্ট এর পাতা ভাসানোর সাথে সাথে শিখে ফেলি স্রোতের অঙ্ক , জোয়ার ভাঁটার হিসেব , গতি এমন কত কি। তবে শুধুই অঙ্ক , বিজ্ঞান নয়, ওই পাতা খাওয়ানো আর স্রোতের যাওয়া আসা দেখতে দেখতে কখন বাবা তার ছোট্ট মেয়ের মধ্যে দিয়ে দিয়েছিলো আরো অনেককিছু। কোনো কোনোদিন সেই বেড়াতে যাবার ব্যতিক্রম হলেই মনখারাপ হতো। তারপর আরো বড় হলাম, কখন বেড়াতে যাওয়া রূপান্তরিত হলো দাবার প্রাকটিস আর সন্ধের ছবি আঁকার মধ্যে। তারপর আরো...আরো....এখন আর সেই বিকেল আসেনা, ল্যাব থেকে যাতে বিকেলে বেরোতে পারি, তারজন্যে সবাই খুব রাগায় ও আমায়। কি করে বোঝাই ওদের বাড়িতে যে আমার এক আকাশ বিকেল আছে, সন্ধে আছে। আছে মরসুমি পাখির ঘরে ফেরা। 

তবু সেই বিকেল আসেনা। এখানের গরু গুলো ও যেন আর আদর করে ঘাড় নেরে দাঁড়িয়ে থাকেনা। চারিদিকের পৃথিবীর মতন এরাও বড় হয়ে গাছে যেন, ব্যস্ত হয়ে গেছে, মুডি হয়ে গেছে। কচি পাতাও আর হাতের নাগালে থাকেনা, ডাল নুয়ে দেবার ও কেউ নেই যে আর ওরাও বোধয় ওই যে সবার মতো মুডি হয়ে গেছে, ইচ্ছেমতন আসবে বা আসবেনা। তাই আর ছুঁতে যাইনা ওদের কাছে, দূর থেকেই দেখি, ভালো আছে। সিম্প্লিসিটির হিসেব গেছে হারিয়ে। তবু সেই সব কিছুর মধ্যে আমার বাবার সেই জোয়ার ভাঁটার গল্প সাথে নিয়ে আজ ও সন্ধ্যে বেলার আমি অবাক হৈ। কখনো মনখারাপ লুকিয়ে কখনো মনখারাপ  ভুলে হেসে উঠি। বুকের মাঝের তোলপাড় গলার কাছে কি যেন একটা আটকে রেখে যখন সেই বিকেলের কালভার্ট খুঁজে চলে মনে মনে, বাইরে অচঞ্চল হাসিতে তখন হয়তো কেউ বলে ওঠে তুই তো খুব খুশি। আর আমার ভেতরের আমিটা চোখ বন্ধ করে দেখতে পায় , কখনো স্রোতের টানে, কখনো স্রোতের প্রতিকূলতায় পাতাটার এগিয়ে চলা, নিজ গন্তব্যে। পাঁকে আটকে গেলে হবেনা। চরৈবেতি চরৈবেতি। এগিয়ে চলাই জীবন। স্থির অচঞ্চল ভাবে এগিয়ে চলা। 

Thursday, 4 July 2019

সপ্তপদী

রেজিস্ট্রি অফিসে চার হাত এক করে দিয়ে যখন রেজিস্ট্রি অফিসার অঙ্গীকার করতে বলে একসাথে থাকার, তখন তাঁকেই যেন মনে হয় ভগবান। কিংবা অগ্নি সাক্ষী করে একে অপরকে সঙ্গে করে চলার সেই অঙ্গীকার : সপ্তপদী। দুই মন তখন পরিপূর্ণ ভাবে চায় একে অপরের কাছে সমর্পন। সেই অঙ্গীকার সেই  শপথ , সে ভগবান যীশুর সামনেই নেওয়া হোক বা আল্লা কে স্মরণ করে, মন্দিরেই হোক বা বৌদ্ধ প্যাগোডাতে সব ক্ষেত্রেই তার মাহাত্ম এক ই। শপথ নেবার মাহাত্ম, তাকে মেনে সারাজীবন চলার যে অঙ্গীকার, কত স্বপ্ন কে সত্যি করার যে গভীর অভীপ্সা, এ সব ই ভীষণ ভাবে সত্যি। সেই সময় খুব কম মানুষ ই ভাবে সে নিজে কতটা সুখী হবে, বরং ভাবে পাশের মানুষটাকে সে যেন সুখী করতে পারে। 

 চার্চের ফাদার ই হোন বা সামনে বসে থাকা পুরোহিত, মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে দুই তরুণ মন কখনো সেই শব্দ সমষ্টির মধ্যে থেকে বুঝে নিতে চেষ্টা করে অন্তর্নিহিত অর্থ আবার কখনো বা সেই শব্দ শুধুই শব্দ হয়ে কানের কাছে গুঞ্জন সৃষ্টি করে আর নিজ নিজ মনের ভিতরে এতদিনের জমে থাকা কত শত স্বপ্নকে আরো একবার নাড়িয়ে চারিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে থাকে । ছেলেটির হয়তো বা মনে পরে বাড়ির সামনে ঘন ঘন সাইকেল করে যাওয়া আসার কথা, আচ্ছা যে মুখটা একবার একটুখানি দেখার জন্যে একদিন কত অপেক্ষা করেছে আজ থেকে সেই মুখ সর্বক্ষণ সবসময় একরাশ হাসি আর অনেক খুশি নিয়ে শুধু তার জন্যে অপেক্ষা করে থাকবে? এই চিন্তায় পুলকিত হয়ে আড়চোখে হয়তো বা পাশের জনকে একটু দেখে নিতে ইচ্ছা করে। সেই তাকানোও গোপন থাকেনা, লুকোচুরি এই চাওয়া পাশের মানুষটির মধ্যেও সঞ্চারিত হয়ে তাকেও করে তোলে শিহরিত। এইভাবে বুঝে বা না বুঝে সম্পন্ন হয় এই সপ্তপদীর অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানের রেশ মনের মধ্যে রেখে শুরু হয় সংসার সাগরে তরী বাওয়া। সহজ তো নয়, সারাজীবনের জন্যে করা একদিনের আকুল শপথ, সারাজীবন স্বাচ্ছন্দে পালন করা। 
ফলে কখনো কখনো ঝড় ওঠে, সংসার তরী টলোমলো হয় ও বা। সেই যে অগ্নিসাক্ষী করেই  হোক বা পরমেশ্বর কে সাক্ষী রেখেই হোক, সেই যে সপ্তপদীর শপথ "Now let us make a vow together. We shall share love, share the same food, share our strengths, share the same tastes. We shall be of one mind, we shall observe the vows together. I shall be the Samaveda, you the Rigveda, I shall be the Upper World, you the Earth; I shall be the Sukhilam, you the Holder - together we shall live and beget children, and other riches; come thou, O sweet-worded girl!"

শয্যা , শয়নে , স্বপনে, সবসময় পাশে থাকার সেই অঙ্গীকার। কখনো বা হয় ব্যাহত। দুই দেহ এক হয়ে গিয়ে এক আত্মা, এক মনন হয়ে যাবার যে স্বপ্ন সপ্তপদীর সময় শপথ নেয় দুই সবুজ মন, অনেক ক্ষেত্রেই তা শুধু ওই মন্ত্র হয়েই থেকে যায়। হয়তো দুই দেহ কখনো এক ই হয়না, এক ছাদের তলায় থেকেও দুই দেহ কখনোই হয়তো হয়না এক। কখনো দেহ মিশে যায়, মন থাকে আলাদা আলাদা জগতে, নিজের নিজের মতন করে। কখনো শুধু মাত্রই জৈবিক কারণে হয় মৈথুন। সন্তান থাকে সেতু হয়ে, ব্যক্তিগত স্বার্থের উর্ধে গিয়ে দুই মন আবার নামে সমঝোতায়, তারপর একসময় আবার হয়তো নিজ নিজ স্বত্বাকে ভুলে দেহের মিলন মনের চাহিদাকে করে পরিপূরণ। 
আর এইভাবেই ভিন্ন ভিন্ন ভাবে হয়ে চলে সপ্তপদী গমন। 
কখনো কখনো ওই যে ওপরে যিনি বসে আছেন, তিনি নেন পরীক্ষা। এই চলার পথের পাথেয় মজবুত কিনা দেখার জন্যে হয়তো কখনো বা ঝড় ওঠে সংসার তরীতে। আর তখন ই বোঝা যায় যে এই সপ্ত গমন এর পথ এতো পলকা নয়, অনেক গভীর এর শিকড়। পাশের মানুষটার এতটুকু শরীর খারাপ সমগ্র পৃথিবীকে দুলিয়ে দেবার জন্যে যথেষ্ট। চারপাশের সমস্ত সম্পর্ক সমস্ত কিছু এক নিমেষে তুচ্ছ হয়ে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে যায়। আর এই বোধয় সেই সপ্তপদীর কাহিনী। সেই শপথ গ্রহণের মাহাত্ম। 








Saturday, 22 June 2019

নামকরণ

বৃষ্টি এলকি?
পশ্চিমের আকাশে কালো মেঘ, গাঢ়, ঘন, গম্ভীর। সূর্য্য অস্ত যেতে দেরি আছে কিছুটা। পশ্চিমের পথেই পা বাড়িয়েছে , পৌঁছনোর একটু আগেই রাস্তা আগলে দাঁড়ালো কৃষ্ণকায় মেঘের দল। সূর্যদেব বললেন, সেই ভালো লুকিয়ে থাকি কিছুক্ষন এই মেঘের কোলে। মাঝেমাঝে সেই মেঘের মধ্যে থেকে বিচ্ছুরিত হতে থাকলো ইন্দ্রধনুর মতন আপনার সাত রং। আর গভীর আকাশ, একদিকে তার মৌন গাঢ় নীল আর অন্যদিকে কৃষ্ণকালো মেঘের থেকে বিচ্ছুরিত সপ্ত ডিঙ্গার রূপকথায় নিজের গভীর অন্তস্থলের আনন্দ কে বর্ণনা না করতে পেরে শিহরিত হচ্ছে। সেই পুলকিত শিহরণ গোপন রইলোনা, ধরিত্রীর ওপরে, সবুজ বনানী কে মাতাল করে দিয়ে ব্যস্ত পৃথিবীবাসীর কাছে মেঘের গুরুগুরু সে খবর পৌঁছে দিলো। প্রচন্ড তাপ দগ্ধ প্রকৃতি অপেক্ষা করতে থাকলো আসন্ন বর্ষায় অবগাহনের। 
প্রকৃতির এই মধুর খেলা কখন যেন আবার এক রূপকথার স্বপ্নজাল রচনা করেছে। 
মনে পরে যাচ্ছে, বেশ কিছু আগের কথা। কত বয়স তখন? কি জানি। কি যায় আসে তাতে? মন ছিল খুব সবুজ। তুমি চাঁপা আনলে , এনেই বললে নাম দাও। তোমার সব কিছুতেই তখন নাম চাই। আমিও দিলাম। বললাম এ আমাদের সাঁঝবাতি। তুমি বলবে রূপকথাটা? আমি হেসে বললাম , থাকবে লেখা। প্রথম প্রথম সাঁঝবাতির কদর খুব, কবে ফুল আসবে, কচি পাতায় গাছ ভরবে, গন্ধে আকুল হবে আমাদের ১০ টা ৫ টার জীবনগুলো। গন্ধরাজ আর মাধবীলতার মধ্যে হেসে উঠবে সে। অপরাজিতার গাঢ় নীলে হবে তার নতুন অভিষেক। 
সেবারে সাঁঝবাতি ফুল দিলোনা। পাতা গুলো কেমন একটা হলদে হয়ে শুকিয়ে গেলো। তোমার রকমারি ফুলের বাগানে আরো নানান অভিজাত নিত্য নতুন কেয়ারি করা পাতার বাহারে খুব ব্রাত্য হয়ে পড়লো তার উপস্থিতি। আমাদের সাঁঝবাতি জ্বললনা আর কোনোদিন ই হয়তো বা। 
কথা ছিল, বৃষ্টির প্রথম জলে সে ভিজবে। কথা ছিল নতুন ভোরের প্রথম আলোতে সে ঘুম ভাঙাবে। কিন্তু শুধু আমরা কি সব সময় প্রথম আর নতুনকেই খুঁজি সবসময়, চিরন্তন কে নয়? কিজানি। তাই বোধয়। 
একটা ঠান্ডা হাওয়া দিলো, লেমনগ্রাস এর গন্ধ টা কেমন যেন নেশা নেশা। আচ্ছা আজ এতদিন পরে, ধরো যদি কোন প্রৌঢ় চশমার কাঁচটা আর একবার পরিষ্কার করে নিয়ে ফিরে তাকাতে চায়, সেই অভিমানে ভরা সোহাগী দিনগুলোর দিকে। বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ, ভেজা মাটি আর ম্লান হয়ে আসা স্মৃতি কি তাকে মনে করাবে কত বলা না বলা প্রতিশ্রুতির গুলোর কাছে। সাঁঝবাতি উঠবে জ্বলে? নামকরণ সার্থক হবে? 






Sunday, 16 June 2019

Fathers' day

পিতৃত্ব পালনের কোনো স্পেশাল দিন হয়, বা পিতাকে স্মরণ করার? কিজানি, হয় হয়তোবা। জানিনা। আমি তো প্রতিটা দিন তোমাকে মনে করি। প্রতিটা ক্ষণ তোমার দেখানো পথে চলতে চেষ্টা করি। 
তোমার আমার অনেক ফটো ও কোথাও নেই, তখন যে আমাদের যখন তখন ফটো তোলা হতোনা, তুমি আমি আমরা আছি সেই পুরোনো অ্যালবাম এর পাতায়, সেই বোধয় ভালো জানো , সেভাবে আমাদের শুধু তোমার আর আমার কোনো ছবি না থাকাই বোধয় ভালো। পৃথিবীর যা কিছু চিরন্তন যা কিছু অবিনশ্বর তাই তো নাকি সবসময় থাকে অগোচরে, চোখের আড়ালে, তাই এই বেশ ভালো। তোমার মান্তুর আর তার বাবার একসাথে কোনো ফটো নাহয় নাই রইলো তবে। 

তুমি আমার সবথেকে বড় ভরসা। ছিলে যেমন আজও তো তাই আছো। ল্যাব এ pcr না হলেও তুমি, মনখারাপ হলেও তুমি, মেনি কে অনেক্ষন দেখতে না পেলেও তুমি বা কোন গাছে কি ফুল হয়েছে তাতেও শুধু তুমি ই। আজ আর সেই তুমি চলে যাবার দিনটাকে মনে করতে চাইনা। কিভাবে কেমন করে যে তুমি তোমার ছোট মান্তুকে হটাৎ অনেকটা বড় করে দিলে, সেসব কথাও থাক আজ। শুধু তুমি সবসময় আশীর্বাদ করো সেই বজ্রকঠোর কুসুমকোমল চরিত্র টা নিয়ে আমি যেন সগর্বে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে পারি। 

ভালোবাসা দুর্বলতা নয়, ভালোবাসা ভালোবাসাই। আবার তেমন ই অনেকের অনেক কিছু হাসিমুখে মেনে নেবার মানেই হেরে যাওয়া নয়, তাদের করুণা করাও তো হতে পারে। এই সব বোধ এখন আমার মধ্যে জাগরিত। এই বোধ গুলোকে আমি বিশ্বাস করি, সঙ্গে নিয়ে চলতে চাই। 

জানো বাবা, যত বড় হৈ , একটা একটা করে দিন যায়, বুঝতে পারি, তোমার দেখানো পথে চলা সহজ নয়, খুব কঠিন তা। 
জানোতো সেদিন খুব কষ্ট হয়েছিল, যখন আমি শুনেছিলাম আমি সবার কাছে ভালো থাকার জন্যেই নাকি সব কিছু করি। মনে পড়লো, এইরকম কথা একবার অনেকদিন আগে, তোমাকে কেউ বলেছিলো, তুমি নাকি ওই যে সব কিছু হাসিমুখে মেনে নিয়ে, বাইরের যত আঘাত সব নিজের ওই বুকের মধ্যে রেখে দাও, কেন করো তা, কেন কিছু বলোনা। তোমাকে কেউ কোনোভাবে এতটুকু আহত করলো মনে হলে, বা তার এতটুকু আভাস ও পেলে তোমার মান্তু যেন ভেঙে চুরচুর হয়ে যেত। ভীষণ রাগ হতো। সেদিন ওই লোকের কাছে ভালো থাকার কথাটা শুনেও মনে পরে গেছিলো হটাৎ, তোমার ওপর কিছুটা ঐরকম ভাবেই করা সেই অভিযোগ। ভালোবাসার ই অনুযোগ ছিল তা যদিও, তবু ছিল তোমাকে না বুঝে করা। আর সেটাই আমার বুকে বেজেছিল। তবু আজও তুমি আমাকে সেভাবেই রেখো বাবা, যেভাবে তুমি আমাকে গড়েছ। 

কঠিন যেখানে হবার, সেখানে যে আমি কতটা কঠিন, তা তো তুমি জানোই, সেইরকম কঠিন যেন না হতে হয় আমায় কারোর ওপরে, সেই কাঠিন্য কে আমি নিজেই ভয় পাই। তোমার মান্তু যেন তোমার আদোরে কুসুমকোমল হয়েই সবার কাছে আসতে পারে। বজ্রকঠিনতা তার থাকবেই। 

রেখো আমাকে ঠিক যেভাবে তুমি দেখতে চেয়েছো তোমার মান্তুকে। আর শোনো, কোনো চিন্তা করোনা, তোমার মান্তু ভালো আছে। খুব ভালো থাকবে সে। কিছুটি ভেবোনা। সব ভালো আছে। অনেক অনেক কথা আছে তোমার সাথে, কিছুই যেন আর বলতে গিয়ে বলা হয়ে ওঠেনা। মনে হয় আরো কত কথা, আরো অনেক। আরো অনেক। তারপর আরো থেকে যায় কথা। আরো। তোমার কাছে গুছিয়ে ভেবে চিনতে কথা বলার তো আর কিছু নেই, সব তোমার জানা। শুধু তুমি দেখো চারপাশের অনেক আঘাত অনেক হতাশা অনেক না পাওয়া, কিছুতেই যেন তোমার মান্তুকে তুমি যেভাবে তৈরি করতে চেয়েছো, সেখান থেকে সে সরে না আসে। আমাদের সময়ে ফাদার্স ডে জানতামনা, জানতামনা mothers day ও , আজ যদি তুমি সামনে থাকতে তুমি না চাইলেও জোর করে তোমার ভালোলাগার জিনিসে জিনিসে তোমায় ভরিয়ে দিতাম একেবারে। জানি তুমি বকতে, কিন্তু তবু দিতাম, জোর করে দিতাম। খুব জোর করতাম। আমার হাতে তুমি সেই যে বাঁধাকপির তরকারি খেতে পছন্দ করতে সেটাও রান্না করতাম হয়তো, হয়তো সেই আলু ডাঁটা বেগুন দিয়ে মাছের ঝোল টাও হয়তো করতাম। 😊সে যাই হোক, মনখারাপ করবোনা, আমি জানি তোমার মান্তুর এতটুকু মনখারাপ বা গম্ভীর মুখ তুমি সহ্য করতে পারোনা। তাই পরের জন্ম বলে যদি কিছু থেকে থাকে, তুমি আবার আমার বাবা হয়েই এসো , তোমাকে রোজ সকাল বেলায় ঘুম থেকে উঠে প্রণাম করে আমার দিন শুরু করবো। 

Wednesday, 5 June 2019

ছাতা

দিল্লিতে থাকাকালীন সেভাবে কেউ ছাতা ব্যবহার করেনা , তবে এবারে কলকাতা গিয়ে বুঝলাম ছাতার অনস্বীকার্য ভূমিকা। ছাতা অর্থাৎ কিনা যে ছায়া দান করে। ছোটবেলাতে আমার একটা রঙ্গীন ওই যে রংবেরঙের ছাতা হয়না, ঐরকম একটা ছাতার খুব শখ ছিল। খুব ইচ্ছে হতো, ঐরকম একটা ছাতার। কিন্তু ওই যে মা বলেছিলো, বায়না করতে নেই কখনো। সেটা নাকি ভীষণ একটা খারাপ জিনিস। ফলত ওই ইচ্ছেটা মনের ভেতরেই থেকে গেছে কখনো আর সামনে আসেনি। সে যাই হোক, আজকে ছাতা নিয়ে লিখতে বসে, প্রথমেই মনে পরে গেল আমার বাবার যে একটা ঢাউস কালো রঙের ছাতা ছিল তার কথা এবং তারপরেই মনে পরে গেল সেই রং বেরঙের ছাতার কথা, যেটা সেই সময়ে আমার কোনো এক বন্ধু নিয়ে আসতো স্কুল এ এবং যার ওপরে আমার যার পরনাই লোভ হয়েছিল। অবাক হলাম এই দেখে যে এই এত বছর পরেও সেই রঙ্গীন ছাতার স্মৃতি এক ই ভাবে মনের মধ্যে ঢেউ তুললো। অর্থাৎ কিনা কোনো ইচ্ছে, কোনো চাওয়া পাওয়া, ভালোলাগা, তা সে যত ক্ষণিকের বা যত তুচ্ছই হোকনা কেন , কিছুই আমাদের ছেড়ে যায়না। সেই ভালোলাগার তরী বেয়ে আমার কাছে এসে পৌঁছনো এক দাবি কে রাখতে গিয়ে শুরু করলাম এই ছাতা বৃত্তান্ত। বলা বাহুল্য যে এ দাবী মেটাতে আমার খুব ভালো লাগছে। চিরকাল ই চেয়েছি আমার ওপর কেউ অধিকার বোধ দেখাক, ভালোবাসার জোর করুক। এমনকি ভালোবাসার সেই জায়গা থেকে কেউ আমাকে তুই এই শাড়িটা পর, বা ওই জুতোটা, বা ওই জামাটা  বা ওই কানের দুলটা খুলে ফ্যাল বা ইত্যাদি ইত্যাদি এমন সব জোর ই যা আপাত দৃষ্টিতে খুব কম মেয়েই মেনে নিতে পারে, তা করে, তাহলে আমার থেকে খুশি কেউ হয়না। সেই কারণেই আমার মায়ের পছন্দ নিজের অপছন্দ হওয়া সত্ত্বেও মেনে নি, কিছুটা সময়ের জন্যে। তবে সে যাই হোক, এই ছাতা প্রসঙ্গে আমার বাবার সেই বড় কালো ছাতাটির কথা না বললে ছাতা কাহিনী নিতান্তই অসমাপ্ত থেকে যাবে। কারণ আদ্যন্ত কাল আমি ওই কালো ছাতাটি দেখেই বড় হয়েছি। তার বাঁট টিও বাঁকানো এবং কালো রঙের। গ্রীষ্ম কালে ওই ছাতাটি সবসময় না থাকলেও বর্ষাতে বাবার সবসময়ের সঙ্গী ছিল ওই ছাতাটি। আর কারোর বাবার হাতে অমন ছাতা দেখতামনা, শুধু আমার বাবার ই অমন পুরোনো আমলের ছাতা। ফ্যাশন সম্পর্কে বেশ সচেতন হতে শুরু করেছি তখন। ফলত ছোট ছোট ফোল্ডিং নানান রঙের ছাতার সামনে বাবার ওই ঢাউস কালো ছাতাটির ওপরে আমার ছিল যার পরনাই রাগ। কেন বাবা শুধু ওই ছাতাটা নিয়েই যায়, বিয়ে বাড়ি থেকে অন্নপ্রাশন কি রোজের স্কুল এ যাওয়া, সবেতেই কালো বাঁকানো বাঁটের লম্বা ইয়া বড় একটা ছাতা হাতে একমুখ হাসি নিয়ে আমার বাবা। কতবার বকতাম বাবাকে, তুমি কেন ছোট ছাতা নাওনা গো, সবাই কেমন ছোট ছাতা নেয়, বাবা বলতো, অরে আমি এত লম্বা, আমাকে পুরোটা বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচাতে গেলে তো এইরকম বড় ছাতাই চাই .খুব ই সহজ সোজা উত্তর। কি আর বলবো। এখন ভাবলে খুব গর্ব হয়। ছাতা নিয়ে সবাই যখন ফ্যাশনেবল, বাবা ভুলেও ভাবতোনা, লোকে কি বলবে কি ভাববে, কিভাবে নেবে। শুধু মিটিমিটি হেসে নিজের যেটা মনে হতো, সেটাই করে যেত। এমন ই ছিল আমার বাবা। কত স্ট্রং ছিল তার will power , কিন্তু কাউকে কিছু বুঝতেই না দিয়ে।
ওই ছাতাটা আর ছাতার অনেকগুলো বাঁট এখনো রাখা আছে। তখন যে জিনিসটার ওপরে খুব রাগ হতো, এখন সেই জিনিসটাকে যেন আঁকড়ে ধরে থাকতে ইচ্ছে করে। মনে হয় একবার ওই মানুষটা আসুক, আসুক সামনে একবার ওই ছাতাটা নিয়ে। খুব গর্ব ও হয়। আমার বাবা যে অন্য আর সবার মতো ছিলোনা। সেই শার্লক এর দাদা মাইক্রফট হোমস এর মতো একটি লম্বা কালো ছাতা বাবার সঙ্গী। পরে এখন দেখি, ইংল্যান্ড এর খুব অভিজাত ফ্যামিলি তে ঐরকম ছাতা নেওয়ার চল আছে। 

যাই হোক, যে কথা বলছিলাম। বলছিলাম অধিকার বোধ এর কথা, দাবী। একটা ছাতা কি আর এমন গুরুত্ব পূর্ণ জায়গা হতে পারে, যে যার জন্যে মাথার যন্ত্রণা থেকে শুরু করে হাতের হাজারো কাজ তুচ্ছ করে অনায়াসে আবোল তাবোল বকবক করতে পারা যায়, একথা আগে বুঝিনি। এখন কথা হচ্ছে এই যে, আজ থেকে ৩০ বছর আগে যদি আমাকে কেউ বলতো ছাতা নিয়ে লিখতে তাহলে আমি কি লিখতাম। তখনো কি আমি এইভাবে লিখতাম যে ছাতা শব্দটি এসেছে ছা ঋতুর রি সমাস থেকে, বা ইত্যাদি ইত্যাদি। নাহ , নিশ্চই এভাবে শুরু করতাম। 

লিখতাম , আমার একটা গোলাপি রঙের ছাতা আছে। গোলাপি রংটা হলো ওর কাপড়টা , বেশ কিছু মেটাল রিব দিয়ে আর একটা স্টিল এর পোলের ওপরে ওই গোলাপি কাপড়টা আটকিয়ে এই যে জিনিসটা আছে, পাপাই বলেছে এটার নাম ছাতা। এখন বাইরে খুব গরম, আমি যখন ই বাইরে বেরোই বা স্কুল এ যাই, এই ছাতাটা নিয়ে যাই। এই ছাতাটা আমাকে সূর্য্যের তাপ থেকে রক্ষা করে। আবার যখন বৃষ্টি পড়ে , তখনো আমি এই ছাতাটা নিয়ে যাই, তাতে আমার গায়ে আর জল পড়েনা। এর থেকে আমার মনে হয়েছে যে যা ছায়া দেয়, বাইরের রোদ , ঝড় , জল থেকে আমাদের বাঁচায় তাই হলো ছাতা। মাঝেমাঝে আমি এই ছাতাটা নিয়ে ঘর ঘর খেলিও, এই ছাতা টা টাঙিয়ে তার ভেতরে গিয়ে আমার পুতুলদের নিয়ে গিয়ে বসি। বেশ লুকোচুরি খেলার মতন আমাকে কেউ দেখতে পায়না কিন্তু ওই ছাতার নিচে আমি বসে থাকি। শীত, গ্রীষ্ম বা বর্ষা বছরের সকল সময়েই ছাতা দরকার হয়। ছাতা সাধারণতঃ দুরকমের হয় (collupsable and non collupsable) কোনো কোনো ছাতাকে গুটিয়ে ছোট করে নেওয়া যায়, আবার কোনো কোনো ছাতা লম্বাই থাকে, তাকে গুটিয়ে নেওয়া যায়না।

ইতিহাস বলে প্রথম ছাতার ব্যবহার শুরু হয় চীন দেশে, এবং যথাক্রমে (প্রাচীন) মিশর, গ্রিস এবং আমাদের দেশ ভারত এ। তবে সমসাময়িক ইউরোপিয়ান বিভিন্ন দেশেও ছাতার ব্যবহার শুরু হয়। এবং পরে ব্রিটিশ শাসনকালে ইংরেজ দের হাত ধরে এদেশে আসে নানান রং বেরঙের হাল ফ্যাশনের ছাতা। বর্তমানে পৃথিবীর সমস্ত দেশ এই ছাতার ব্যবহার করা হয়। ১০ th february কে বিশ্ব ছাতা দিবস বা national umbrella day হিসেবে পালন ও করা হয়। বার্বি থেকে শুরু করে নানান জাপানী পুতুলের হাতে খুব সুন্দর সুন্দর ছাতা থাকে।

পাপাই বলেছে, ছাতা শব্দ টা এসেছে সংস্কৃত শব্দ ছত্র থেকে। হিন্দু, বৌদ্ধ আর জৈন ধর্মের কাছে ছাতা খুব একটি শুভ চিহ্ন। যার সূত্র ধরেই অনেক দেব দেবীদের মাথায় ছাতা দেওয়ার একটি রীতি আছে, এবং একসময় বিভিন্ন রাজা রাজরাও যা নিজেদের আভিজাত্য দেখানোর ক্ষেত্রে বহন করে থাকেন। ছাতার ইংরাজী প্রতিশব্দ হলো umbrella.
ছাতাটা যেন আমার পাপাইয়ের মতন। আমার পাপাই যেমন সব কিছু থেকে আমাকে বাঁচিয়ে রাখে, আগলে রাখে, এই ছাতাটাও যেন তাই।

ছাতা টা বাবার মতন না বাবারা ছাতা হয়ে আমাদের সবকিছু থেকে আগলে রাখে, ঢেকে রাখে সে কথা ঠিক করে বোঝার ক্ষমতা আমার তখন ঠিক হয়নি, কিন্তু এখন হয়েছে। এখন বুঝতে পারি, বাবারা সত্যি ই ছাতার মতন করে আমাদের কে বাহ্যিক যা কিছু অসহনীয় তার থেকে ঢেকে রাখে, আগলে রাখে। প্রতিটা পদক্ষেপে ঠিক কোথায় কোথায় কি কি করতে হবে, কিভাবে গেলে তাঁর সন্তান সুরক্ষিত থাকবে, এমনকি শুধুই ওই মুহূর্তের জন্যে নয়, চিরকালীন চিন্তা করে, ভবিষ্যতে ও যাতে সে এক ই ভাবে সুরক্ষিত থাকতে পারে, এইসব ভেবে, আমাদের এক একটা পদক্ষেপের আগে থাকে ওই মানুষটার এই এতকিছু ভাবনা।
তাইতো শুধু ছাতা নয়, যখন অনেক বড় বড় কোনো গাছ দেখি, মহীরুহ , এইরকম মোটা মোটা গাছের গুঁড়ি , গায়ের রং কেমন একটা কালচে বাদামী , বিশাল বিশাল ডাল পালা পাতা, অনেক রোদের মাঝেও যার তলায় গিয়ে দাঁড়ালে সমস্ত দেহমন শীতল হয়ে জুড়িয়ে যেতে বেশি সময় লাগেনা। খুব রোদে তাপে পথ যখন রুক্ষ হয়ে রাস্তা আগলে দাঁড়ায়, তখন মনে মনে আমরা খুঁজে চলি এমন ই কোনো মহীরুহ কে, মনে হয় একটু দাঁড়াই কাছে গিয়ে, একটু বসি এর তলায়। ওই শান্তির আশ্রয়টাই অনেকটা পথ হেঁটে যাবার শক্তি জুগিয়ে দেবে। খুব ভাগ্যবানরা তাদের মা বাবাকে জীবনের অনেকটা পথ পর্যন্ত পায়, তাদের আলো ছায়ায় ভরিয়ে রাখার জন্যে, ছেলেমেয়ের ছাতা হয়ে থাকার জন্যে। আর আমার মতন হতভাগ্য যারা যারা জীবনের কিছু টা চলেই ওই ছায়া থেকে বঞ্চিত হয়, তখন মাথা কুটে মরে গেলেও সেই স্নেহময় মধুর ছায়াটি যেন কিছুতেই পাওয়া যায়না। তবে না হয়তো বা এটা ঠিক ব্যাখ্যা হলোনা বা, কারণ physically ওই মানুষটাকে কাছে পাই বা না পাই, তাঁর স্নেহচ্ছায়া থেকে বঞ্চিত আমি একথা কখনো ঠিক নয়। কখনো নয়। তাঁর স্নেহছায়া আছে বলেইতো সব কাজে এত জোড় পাই, শক্তি পাই। তবে হ্যাঁ এটাও ঠিক যে কখনো কখনো ওই ছাতার মতো কাউকে সামনে থেকে সত্যি পেতে খুব ইচ্ছে করে। আমরা যে রক্ত মাংসের মানুষ। তাই নয়নের সম্মুখে না থেকে নয়ন মাঝে ওই মানুষটা ঠাঁই নিয়ে আছে জেনেও, তাকে নয়নে সম্মুখেই তবু চাই। বাবারা যেভাবে আগলে রাখে, তা কেউ ই পারেনা কখনো। তবে জীবনে চলার পথে বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষ কখনো কখনো আসে, তাদের মধ্যে, না ছাতা হয়ে হয়তো কেউ আসেনা তবে তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছাতা হাতে করে নিশ্চই আসে। কিছুটা সময় কিছুটা রাস্তা ওই যে যতটা আমাদের ভাগ্যে বরাদ্দ থাকে, ততটা রাস্তা বেশ নিশ্চিন্তে হাঁটা যায়। মনে হয় এখানে আমার মাথা ঘামানোর দরকার নেই, দরকার নেই অকারণ চিন্তার। আমার কাজ শুধু হেঁটে যাওয়া। পাশের মানুষটার ছায়ায় বেশ নিশ্চিন্তে আমি চোখ বন্ধ করে হেঁটে যেতে পারি।

আজ যখন বাবা আর কাছে নেই, তার সেই ঢাউস ছাতার নিচে তার আদরের মান্তুকে আগলে সমস্ত রোদ, ঝড়, জল থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে চলার (physically), তখন ও মনে এখনো চোখ বন্ধ করে সেই ছবিটাই ভেসে আসে, আর মন বলে, এই মান্তু তো নাহয় বড় হয়ে গেছে অনেক। কিন্তু আরো ছোট্ট মান্তু যেন ওই ছাতাটা পায়। ঠিক করে। যেন ঝড়, বৃষ্টি, রোদের আঁচ না লাগে তার গায়ে।  

Tuesday, 4 June 2019

কানায় কানায়

টলটলে শান্ত স্থির শীতল দীঘির ধারে থাকতো এক মাছরাঙ্গা। শান্ত সবুজ আলোছায়া ঘেরা গাছগাছালি। ঝিকিমিকি দীঘির জল।  দিন যাচ্ছিলো তার নিজের মতো করে। দীঘির জল এ  ডুব দিতো, মাছ নিয়ে মুখে করে তার ছোট্ট বাচ্ছা মানুষটাকে দিতো, তারপরে ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমীর গল্প বলতে বলতে কখন ঘুমিয়ে পড়তো। একটু একটু করে ওই তার ওই ছোট্ট ছানা টিকে বড় হতে দেখতে দেখতে তার দুচোখ আশায় গর্বে ভোরে উঠতো। এইভাবে রূপকথার জগতে তরী বেয়ে তার দিন কাটছিলো। 

এমন সময় একদিন ধ্যানমগ্ন মাছরাঙ্গা যখন দীঘির ধারে চুপ করে বসেছিল, হয়তো বা তার চোখে ছিল কোনো মেঘের ছায়া। সময়টা ছিল শীতকাল। দেশ বিদেশের পরিযায়ী পাখিরা তার এই সুন্দর গ্রাম বাংলার ছায়া সুনিবীড় শান্তির নীড় এ আসছিলো, যাচ্ছিলো। সেইরকম কোনো এক বিষন্ন বিকেলে, শীতের আসন্ন সন্ধ্যের নিস্তব্ধতার মধ্যে দেখা হলো এক পরিযায়ী পাখির সাথে। অনেকটা আমাদের দেশের চড়াই পাখির মতো যার আকার আয়তন, অর্থাৎ কিনা মাছরাঙ্গার থেকে অনেক পুচকে মতন ছিল সেই পাখি। সাদা রঙের পালকে ঢাকা, আর দলের নানান সঙ্গীদের থেকে ছিল একেবারেই সাধারণ তার চাল চলন আহার বিহার। তা সেই পাখি তার চোখে দেখলো আসন্ন রাত্রির ছায়া। জানতে চাইলো কারণ, বললো এইতো রাত পেরিয়েই আবার ভোর হয়ে যাবে, কেন তবে তুমি মনখারাপ করে আছো। মাছরাঙ্গা বললো বসবে আমার পাশে, আমার এই স্থির শান্ত দীঘির ধারে। পরিযায়ীর মনে ছিল চিরকালীন থিতু হবার স্বপ্ন। বসলো সে। তারপরে কত কথা কত কাহিনী। যেন জন্ম জন্মান্তর ধরে দুই ভিন্ন দেশী ভিন্ন পরিস্থিতির পাখির মনে জমেছিলো কত হাজারো না বলা গল্প। ধীরে ধীরে সেই একদিনের অল্প আলাপ পরিণত হলো গভীর বন্ধুত্বে। মাছরাঙ্গার মনে হলো তার যে এমন এক সুন্দর গাঢ় নীল রং আছে, একথা এমন ভাবে তো তাকে কেউ বলেনি, আর পরিযায়ীর মনে হলো তার এই যে সাদা রংটাকে সে এতদিন খুব সাধারণ ভেবে এসেছে, তা সত্যি ই কাউকে রঙ্গীন করে তুলতে পারে? এইভাবে কিছুদিন স্বপ্নের মতো কেটে চললো। পরিযায়ীর ফেরার পালা, মন চায় তার স্থির নিস্তরঙ্গ এক জলতরঙ্গ। চির শান্তির আশ্রয়। আর মাছরাঙ্গার ক্ষণিকের জন্যে মনে হলো, আমিও যদি যেতে পারতাম দূর থেকে দূরে। "নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপারে তে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস। " তারা দুজনেই না পারে, তাদের আপন আপন বৃত্ত ভেঙে বেরোতে, না পারে সেই বৃত্তের ভেতরে থাকতে। এমনি এক অবস্থায় পরিযায়ী বারবার চলে আসে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে সেই ঝিলের ধারে , দুজনের দেখা হয় কিন্তু তাতে আরো বেশি কাছে পাবার ইচ্ছে প্রবল হয়ে ওঠে। পরিযায়ী ভাবে এ কি বিড়ম্বনা। এ দেখা নাহোলেই ছিল বেশ ভালো আর নীলকণ্ঠী মাছরাঙা ভাবে দেখা হয়েছে যখন,তখন এর কিছু শুভ উদ্দেশ্য নিশ্চই আছে। ওপর থেকে বিধাতা হাসেন। আর এভাবেই দুই দূর প্রান্তের দুই ভিন্ন পরিস্থিতিতে থাকা মন নিজেদের মতো করে একে অপরের কর্তব্য পালন করে চলে, আবার সেই দুই মন নিজেদের মতো করে একে অপরের কাছে আসে। তাদের ভিন্ন জায়গা, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন আচার বিহার, তবু কি যেন এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন তাদের একে অপরকে রেখেছে বেঁধে। 
আসলে ক্ষুদ্রতর জায়গায় যা আলাদা, বৃহত্তর ক্ষেত্রে তাই যে এক। ধরো পৃথিবীর এক প্রান্তে যখন দিন অন্যপ্রান্তে তখন রাত , একদিকে যখন ঠান্ডা অন্যদিকে তখন গরম অথচ আবার যখন বৃহৎ বৃহৎ অনেক বৃহত্তর বৃত্তে আপন আপন গন্ডির বাইরে গিয়ে যদি আমরা ভাবি, তখন দেখি একটি ই সূর্য্য এই কান্ডটি ঘটাচ্ছেন , সেই এক ই সূর্য্যকে আমরাও দেখছি আবার দেখছে অপর পক্ষের সবাই ও। আকাশ ভরা তারা জায়গা বিশেষে পর্যোবেক্ষণের অবস্থান বদলায় ঠিক ই কিন্তু যার পরিপ্রেক্ষিতে তা বদলায় সেই বিশাল অসীম মহাবিশ্বের প্রেক্ষাপট যে একটি ই। সেই এক ই আকাশ। এক টি ই চাঁদ। যে চাঁদ দেখে রবিঠাকুর বলে উঠেছিলেন "চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে", সেই চাঁদ দেখেই আবার Wordsworth বলেছেন "The Crescent-moon, the Star of Love, /Glories of evening, as ye there are seen".    
তবু রক্তমাংসের বাস্তব দুনিয়াতে এমন দার্শনিক কথা মেনে এবং মনে নিয়ে চলা খুব দুষ্কর। ফলত: ঝড় উঠতো, এবং সেই ঝড়ে কখনো আমাদের নীলকণ্ঠী অভিমানে গলা ফুলিয়ে বসে থাকতেন, কখনো বা শুভ্র চড়াইটি মুখ কালো করে অভিমানে মুখ লুকোতে। নীলকণ্ঠীর মনে হতো তুমি তো আর কখনো আমার হয়ে থাকবেনা, কেন তুমি আমার হয়ে থাকতে পারোনা? অভিমানে তার গলা ধরে আসতো, চোখে আসতো জল, মনে হতো এসব মিথ্যে, কখনোই পরিযায়ী আমার হবেনা, একদিন ঠিক আমাকে ভুলে অনেক দূরে চলে যাবে। পরিযায়ীর মনে হতো, নীলকণ্ঠীর নিজের দুনিয়াতে সে বড় ব্রাত্য। কেনই বা সে তার সুন্দর স্থির নিস্তরঙ্গ জল এ ঢেউ তুলে যাবে? নাহ এ তার কখনোই ঠিক নয়, এভাবে তার শীতল দীঘিতে ঢেউ তোলার সে কেউ ই নয়। সে আর কখনো নীলকন্ঠীর বৃত্তের ভেতরে আসবেনা। এমন কথা শুনে নীলকন্ঠীর হতো রাগ, সে প্রমান করতে বসত যে বস্তুতঃ ই  তার দীঘির জল না ছিল কখনো শান্ত, না ছিল কখনো শীতল। পরিযায়ী চড়াই দিতো কানে আঙ্গুল, কিছুতেই সে শুনবেনা। এভাবেই সময় পেরোচ্ছিলো। 

এই দুটির কথা অলক্ষ্যে জানতেন শুধু একজন, তিনি চুপচাপ মিটিমিটি হেসে লিখে চললেন কাহিনী। সে কাহিনীর শুরু কিভাবে কোথায় বা শেষ সে সব কথা ধীরে ধীরে হলো অপ্রাসঙ্গিক। সে কাহিনীতে সত্যি হয়ে রইলো শুধু ঝিলের শান্ত নিস্তরঙ্গ জল, ঝিকিমিকি সূর্যের আলো, কালো পিচ ঢালা রাস্তা, শীতের উষ্ণ আদর, গ্রীষ্মের দাবদাহ, বর্ষার জল, ভরা নদী, অপরাজিতার গাঢ় নীল, গোলাপের পাপড়ি, জুঁই এর শুভ্রতা, গন্ধরাজের মত্ততা, কৃষ্ণচূড়ার লাল, চাঁপার মৃদু অথচ উজ্জ্বল মধুর তেজ, সুবাসিত রাত্রি, ভোরের স্নিগ্ধতা, নতুন দিনের আশা, সোনালী বিকেল, গোধূলির আবেশ, ধূপের গন্ধ, ধুনোর ঘোর, শঙ্খ ধ্বনির শান্তি, কাঁসার থালার সাবেকিয়ানা, খাওয়ানোর আকুলতা এমন কত কি। আর এই সব কিছু আবর্তিত হতে থাকলো ওই একটি ই সূর্য্য , একটি ই চাঁদ , এক ই আকাশ ভরা তারা, আর একরকম রং এক ই তুলি দিয়ে আঁকা একরকম স্বপ্নকে ঘিরে। সেই স্বপ্নই তাদের নিজ নিজ জায়গার ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে তাদের স্থির রাখতো, জোর দিতো মনে, দুর্বলতা নয়, শক্তি হয়ে থাকতো , আর দিনের শুরুতে তাদের মনে হতো আর একটা নতুন দিন, আর একটা নতুন স্বপ্ন, আরো একবার নিজেদের সব কিছু জেনে নেবার বুঝে নেবার সময়। আর দিন শেষে তারা সারাদিনের ছোটো বড় সকল প্রাপ্তিকে একে অপরের সাথে ভাগ করে নিয়ে চলতে থাকলো। 

না প্রয়োজন কিছুমাত্র ছিলোনা এদের একে অপরকে, কিন্তু সকল প্রয়োজন সব স্বার্থের থেকে উর্ধে উঠে এই যে সম্পর্ক, এর নাম আমার জানা নেই, জানা নেই হয়তো বা এ বিশ্বের সেই মহাকাল সেই মহাকবির ও। তাই হয়তো তিনিওবা তখন আপন লেখনী থামিয়ে অবাক নয়নে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এ পৃথিবীর বুকে সূর্য্যকে বললেন আরো মধুর হয়ে উঠতে, চাঁদ কে বললেন আরো স্নিগ্ধ আরো নরম হয়ে আদর হয়ে জড়িয়ে রাখতে, আর ফুলে ফলে রঙে রসে সবুজে সবুজে ভোরে দিতে প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটি ক্ষণ। প্রতিদিনের যে বাঁচা সকল স্বার্থের থেকে উর্ধে এসে থাকতে পারে, যার মধ্যে এতটুকু স্বার্থের ছোঁয়া থাকেনা এমন গভীর বোধের গোপন প্রাপ্তিকে কেউ না বুঝুক শুধু তার ব্যাপ্তিটুকু এই দুই মন কে কানায় কানায় রাখুক ভরিয়ে। সেই দুই মনের গভীরে তাই সকল কলুষতা হিংসা স্বার্থ হানাহানি কাড়াকাড়ি লড়াই কিছু প্রবেশ করতে পারেনা, সকল অশান্তি যেন ঠিক ওই দীঘির জল এর মতোই স্থির শান্তি নিয়ে এসে দুই মনকে একেবারে ভিজিয়ে দিয়ে যায়, আর সেই ভেজা মনের নরম মাটিতে জন্ম নেয় নব বোধের কচি সবুজ চারাগাছ; ভালোবাসায় আদোরে সোহাগে যত্নে তাতে ফুল আসে, ফল হয়, সবুজ চারাগাছ পরিণত হয় মহীরুহে , ছায়া দেয়। আর সেই ছায়া, নতুন উজ্জ্বল আলোর সাথে মিশে গিয়ে এক অদ্ভুত মায়াজাল রচনা করে এই দুই মনকে পরিপূর্ণ করে রাখে। কানায় কানায়। এর যেন বিরাম নেই, বারণ নেই, নেই থেমে যাওয়া, সেই যে একসময় কালিদাস যেমন লিখেছিলেন সেইরকম ই বলতে ইচ্ছে করে, সহস্র বৎসর যেন এইভাবেই এক লহমায় পেরিয়ে যায়। এই কানায় কানায় পরিপূর্ণতা যেন সকল অপ্রাপ্তি, সকল অন্ধকারকে একেবারে আলোয় আলোয় প্রাণ দিয়ে ভরিয়ে দেয়। কানায় কানায়। 

Wednesday, 22 May 2019

জন্মান্তর

সেদিন, হটাৎ ছেলেটি মেয়েটিকে বললে,
এই আমাকে তুই বলে ডাকবি? ডাকনা।...
মেয়েটি অবাক।....যাহ , তুমি করে ডাকতে ডাকতে হটাৎ আবার তুই বলা যায় নাকি,
ছেলেটি জেদ করলে একবার বলার জন্যে।..
কেন এমন অদ্ভুত আবদার।
অবাক হলো মেয়েটি
পরে বুঝেছিলো, খুঁজে পেয়েছিলাম মাতৃ ছায়া আকাঙ্খিত এক অবুঝ বালক কে
যে বারবার তার পরম কাছের জায়গা থেকে খুঁজে পেতে চেয়েছে মা এর মমত্ব
সহোদরা, বন্ধু, সখী , প্রেমিকা, স্ত্রী। .....বয়সের সাথে সাথে অজস্রের সম্পর্কের ভিড়ে , অনেক দায়িত্বের আবডালে কেউ আর আলাদা করে মনে করেনি বা করায় ও নি, যে তার ও চাই একটা মাতৃক্রোড়ের মতোন ভরসাস্থল
এক নিশ্চিন্তে বাহুডোর
এক অনন্ত আশ্রয়।
মৈথুন রত ক্লান্ত শরীর কি শুধুই শরীর হাতড়ে চলে,
তার মধ্যে কি শুধুই থাকে ভোগের ইচ্ছা, চেতনাহীন, বোধহীন অনন্ত সম্ভোগ?
শুধুই ?
আমি যদি বলি, স্নেহহীন , মমত্ব হীন মৈথুন ধর্ষণ এর ই সমান।....
ধর্ষিত কি শুধু নারী ই হয়,
পুরুষ নয়.........
সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীর যখন চেয়েছে সঙ্গিনীর নরম বক্ষস্থলের উষ্ণ আদোরে গলে পড়তে,
তখন হয়তো তাকে মেটাতে হয়েছে সঙ্গিনীর ই রতি লিপ্সা
তার সন্তুষ্টি আর তৃপ্তির সঙ্গে মিশে যেতে যেতে কখন ভুলে গেছে নিজেরও কিছু চাওয়ার ছিল
বীর্য্যস্খলন এর যন্ত্রণা নয়, তার সুখ শরীরের প্রতিটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে বইয়ে দেওয়ার, বইয়ে নেওয়ার গভীর অভীপ্সা।
সমঝোতার মধ্যস্থতা নয়, দুটো মনের সঠিক বোঝাপড়ার পরে এক হয়ে মিশে যাওয়া।
শুধুই স্বামীত্বের কর্তব্য নয়, স্বামী হয়ে উঠতে পারার পরম প্রাপ্তি কে আপন স্বত্বার প্রতিটা বিন্দুতে অনুভবের ইচ্ছা।
আত্মগ্লানির মধ্যে জেগে ওঠা নয়,
নতুন ভোরের স্নিগ্ধতার মধ্যে, সলাজ মধুর স্মৃতির রোমন্থনের মধ্যে দিয়ে, নতুন ভোরের পবিত্রতার মধ্যে দিয়ে, নতুন করে মাতৃ ক্রোড়ের মতোই নিশ্চিন্ত তার সঙ্গে ঘুম ভাঙা।..আর দিনের আলোর মতো চেতনা বোধ মায়ায় এগিয়ে চলা।
অবাক হচ্ছেন, ভাবছেন মৈথুন কিভাবে মাতৃপ্রেম এর সাথে তুলনীয় হয়?
হয়....প্রেম মনের এক প্রকাশ, যা সম্পর্কের পরিবর্তনে তার রূপ বদলায় মাত্র, আর আমাদের অন্তরের অন্তস্থলে বয়ে চলে সেই প্রেম এর অবিনশ্বর ধারা।...
যেহেতু মা বাবা হচ্ছেন সবথেকে বিশ্বস্ত জায়গা
তাই....
পুরুষ তার সঙ্গিনীর থেকে খুঁজে চলে সেই নিশ্চিন্ততার জায়গা
নারী তার সঙ্গীর কাছ থেকে খুঁজে চলে সেই ভরসাস্থল
আর যখন এই দুই চাওয়া সম্পূর্ণ হয়, তখন হয় প্রকৃত মিলন
কখনো নারী সেই পর্বত সমান বক্ষস্থলে চায় ছোট্ট চড়াই পাখিটি হয়ে থাকতে
আবার কখনো বা নিজ বক্ষের নরমে আগলে রাখে সেই পর্বত এর ই শিশু সুলভ সত্তা।
সমুদ্র মন্থন এর পরে, আকণ্ঠ গরল পান করে শিব যখন হলেন নীলকণ্ঠ
তখন স্বয়ং পার্বতী তাঁকে আপন স্তন্যের সুধা পান করিয়ে সেই গরল কে অমৃত রূপ দান করলেন।
মহাকাল তখন এক শিশুর মতন মাতৃরূপী পার্বতীর কাছে নিজেকে করলেন সমর্পন।
আর পরম যত্নে, মমতায় পার্বতী আপন সন্তান স্নেহে শিশু ভোলানাথের মুখে দিলেন নিজ স্তন।
কি অপূর্ব, কি অসাধারণ সেই সৃষ্টি।
প্রেম ও প্রকৃতি যদি একাত্ম হয় রচনা হয় যুগান্তকারী সৃষ্টির
নারী পুরুষ তখন উন্নীত হয় শুধুই নারী পুরুষের সাধারণ সম্পর্কের থেকে অনেক ওপরে।

আর এইভাবেই আমাদের নিজেদের অজান্তেই , অজ্ঞানে, হয়তো ফল্গুধারার মতো নারীমনে বয়ে চলেছে, তার পাশের মানুষটিকে যত্নে স্নেহে সমস্ত সংসার গরল থেকে রক্ষা করার বাসনা।....যা তাদের শুধুই  প্রেমিকা, শুধুই স্ত্রী, শুধুই সখার জায়গা থেকে নিয়ে যায় আরো ওপরে।
আর পুরুষ, সমাজ সংসার এ সকল দায়িত্ব , কঠোর কর্তব্যের পরেও মনের গভীরে থাকে এক মা এর খোঁজ, নিজের অজ্ঞানে, অচেতনে
কোথাও হটাৎ যদি সেই স্নেহ ময় মাতৃ রূপ এর সাথে এতটুকু মিল খুঁজে পাওয়া যায়, তখন মন বলে ওঠে এই খুঁজছিলাম,
কিন্তু কজন নারী একাধারে বান্ধবী, প্রেমিকা,  থেকে সহধর্মিনী হয়ে উঠতে পারে ?
মাতৃরূপে আপন মমতায় পাশের পুরুষটিকে রাখে আগলে ?
আর কজন পুরুষ ই বন্ধু, প্রেমিক, সখা থেকে সত্যি স্বামী হয়ে উঠতে পারে?
বা স্বামীত্বের অধিকার বোধ পেরিয়ে পিতৃত্বের সুরক্ষার আবডালে রাখতে পারে পাশের নারীটিকে
হোকনা নাহয় জন্মাতর এবার ,
নবজন্ম পাক সংসার প্রেম
নব চেতনায় উন্মীলিত প্রেম বোধ তব
ফিরিয়ে আনুক মোরে নব নব রূপে
দিক ফিরিয়ে তোমারে
এ সংসার সাগরে।
বারেবারে।

Thursday, 9 May 2019

আমার পঁচিশে বৈশাখ- tribute to Rabindranath

আজ পঁচিশে বৈশাখ। আমার পঁচিশে বৈশাখ বলতেই চোখ বন্ধ করে একটাই স্মৃতি খুব উজ্জ্বল ভাবে ভেসে ওঠে মনে। সেটা হলো আমার মেজদিদার বাড়ি। দোতলার দক্ষিণের ঘরের টেবিল এর ওপরে বড় একটা কবিগুরুর ছবি। দুপাশে পেতলের ফুলকারী কাটা ফুলদানীতে পুকুর পাড়ের কৃষ্ণচূড়া গাছের থেকে আনা লাল টকটকে উদ্ধত কৃষ্ণচূড়ার গুচ্ছ। মাসি ধুপ জ্বালাতে জ্বালাতে বলছে নমো করো। একটা জিনিস ওই তিন চার বছর বয়সে আমি কিছুতেই বুঝতে পারতামনা। রবি ঠাকুর কি ঠাকুর? তাহলে ওপরের ঠাকুর ঘরে না থেকে বই এর টেবিল এ কেন ? খুব বড় প্রশ্ন ছিল এটা আমার মনে। বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম বাবা বললো ঠাকুর তো সবজায়গাতেই থাকে, এখানেও আছে ওখানেও আছে। ঠিক সন্তুষ্ট না হলেও শিশুমন এটুকু  বুঝেছিলো যে ঠাকুর ঘরে থাকা ঠাকুরদের মতন এই ঠাকুর একদম ধরা ছোয়াঁর বাইরে বুঝি নয়, প্রতিদিনের পাঠ্যের মধ্যে এঁকে পাওয়া যায়, নিজের বই এর বনে থাকে বাঘ গাছে থাকে পাখি যে বলেছে সেই আবার দিদির বই এর আঁধার হলো মাদার গাছের তলার কথাও বলেছে, গরমের সন্ধেতে বা চাঁদনী রাতে মায়ের গলার গানে যেমন আছে আবার মামার সেতারেও তার সুর বাজে । গরম কালের সন্ধেতে চাঁদের আলোতে ভেসে যাওয়া ছাদে মাদুর পেতে বসে মা যখন গান গাইতো, কিংবা দুপুর বেলা শুয়ে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে 'লুকোচুরি' শোনাতো, তখন মা এর দুপাশে আমরা দুবোনে শুয়ে সত্যি সত্যি চাঁপার গাছে চাঁপা হয়ে ফোটার কথা ভাবতাম, অথবা মা যখন বলতো 'যখন যেমন মনে করি তাই হতে পাই যদি '..আর আমার মন ও সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠতো, আমি যেন এখুনি হৈ ইছামতি নদী। তারপরে বড় হওয়ার সাথে সাথে আলাদা করে আর বিষ্ময় নিয়ে রবি ঠাকুরকে ভাবতামনা, রবি ঠাকুর তখন পড়াশুনা ইত্যাদির মধ্যে হটাৎ করে রবীন্দ্রনাথ হয়ে গিয়ে পাঠ্য পুস্তক আর পঁচিশে বৈশাখ এর অনুষ্ঠানের মধ্যে আটকে গেলেন। কিন্তু ফিরে পেলাম তাকে আবার, খুব অভিনব ভাবে। কৈশোর পেরিয়ে যৌবন আসবো এসব করছে, আবার কৈশোর ও যাবো কি যাবোনা ভেবে থমকে দাঁড়িয়ে আছে, এমন একটা সময়, যখন আমাদের পাড়ার পল্লীশ্রী পাঠাগারের ছোটদের বিভাগের পাণ্ডব গোয়েন্দা, এমনকি ফেলুদা, কাকাবাবুতেও ঠিক মন টাকে বেঁধে রাখতে পারছেনা, প্রায়শই উশখুশ করছে পাশের বিভাগের বইগুলোর দিকে, বাড়িতেও বড় দের মার্ক করে রাখা বই গুলোর দিকে প্রায় ই হাত বাড়াতে ইচ্ছে হচ্ছে। এমন সময় এক গোছা গোলাপের গন্ধের সাথে হাতে এসে পড়লো বুদ্ধদেব গুহর বাবলির। বুঝতেই পারছেন সবাই, কৈশোরের প্রথম প্রেম নিবেদন হাতে এসে পৌঁছেছিল আর কি। সে গোলাপের রং টকটকে লাল ছিলোনা, ছিল নেহাৎ ই অপটু হাতের কারোর বাগান থেকে ছিঁড়ে আনা একগোছা গোলাপি প্রকাশ। কিন্তু নিষেধের বেড়া জালের মধ্যে সেটুকু হটাৎ প্রচন্ড উত্তেজনায় কিশোরী মনকে রোমাঞ্চকতায় ভরে দিতে যথেষ্ট ছিল, সে কথা বলাই বাহুল্য। সেই প্রথম বড়দের বই। পড়ার পরে আবার ফেরত দিতে হবে। কি আছে ওই বইতে? কেন আমাকে পড়তে দিলো? উত্তেজনায় আর তর্ সইছিলোনা, পড়ার বইয়ের নিচে লুকিয়ে পড়তে শুরু করে দিলাম। অভিরূপ আর বাবলি সবে হাতে হাত দিয়ে বেড়াতে বেরোচ্ছে এমন সময় পিছন থেকে মা এর চিৎকার, কে দিলো এই বইটা? কোথা থেকে পেলি এ বই তুই? এ বই পড়ার মতন তো তোমার বয়স হয়নি। ওগো দেখে যাও তোমার আদুরে মেয়ের কান্ড, আদোরে আদোরে তো বাঁদর করেছো , এবার বোঝো। ..ইত্যাদি ইত্যাদি, বাস্তবিক ই আমি সত্যি ই সেদিন তখন কিছুতেই বুঝে উঠতে পারিনি যে বই তো ভালো জিনিস, সেটা আমাকে একজন দিয়েছে আর আমি নিয়েছি, এতে দোষের কি হয়েছে। আমার কথাও যে সেদিন আমার জননী শোনেননি সেটিও বলাই বাহুল্য। প্রচন্ড বকা ঝকা যথারীতি আমি চোখের জলে বালিশ ভাসাচ্ছি এমন সময় কানে এলো পাশের ঘর থেকে আমার বাবা আর আমার এক মামা সেদিন এসেছিলেন, দুজনের কথোপকথন। বাবা একটু চিন্তিত গলাতে মামাকে বলছিলো, বুঝলি বাবুন ছেলে মেয়েরা যতক্ষণ না সব বুঝতে শিখছে ততক্ষন যে কি চিন্তা, আমি মরমে মরে যেতে যেতে শুনতে পেলাম আমার মামা খুব হালকা ছলে বাবাকে বলছে এতো ভাববেননাতো রঞ্জিতদা, এবারে মান্তুর হাতে রবীন্দ্রনাথ তুলে দিন, এখন ওর রবীন্দনাথ পড়ার বয়স , দেখবেন ওই যে কোনটা পড়বো আর কোনটা পড়বোনা, কোনটা বুঝবো আর কোনটা বুঝবোনা, কতটা নেবো আর কতটা নেবোনা সেই সব ভাবনা কেমন এক দিকে channelise হয়ে যাবে। মায়ের অভিযোগ অনুযোগ মেয়ের কান্না এইসবে জর্জরিত অসহায় ভালো মানুষ আমার বাবার গলায় বেশ একটা উৎসাহ এসে গেল হটাৎ। বললো ঠিক বলেছিস, বঙ্কিম কেও এখন ই দিতে হবে। অর্থাৎ কিনা অমৃত রসে আগে সম্পৃক্ত করে দেওয়া হোক অপরিণত মনটাকে, তারপরে, পরিণতির সাথে সাথে যে রকম ই এক্সপোজার ই পাকনা কেন, যে রসে মজে আছে মন , সেই রসে সিক্ত মন নিজেই বিচার করে নিতে পারবে, কোন রসে, কিভাবে কতটা মজবে। পরে বুঝেছি কি অসাধারণ স্ট্রাটেজি। কি অভিনব উপায়ে আমার বড় হওয়ার সাথে সাথে এক একটা মাইলস্টোন দিয়ে আমার ভাবনা চিন্তা গুলোকে একটা লক্ষ্য দিয়ে দিয়েছিলেন আমার চারপাশের এই মানুষগুলো।যাতে অস্থির হয়ে দিকভ্রান্ত না হয়ে সবকিছুকে খোলা মনে বুঝে বিবেচনার সাথে গ্রহণ করতে পারি। সেই প্রথম পাশের ঘরের সেই কথোপকথনের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথকে আমার অন্যভাবে পাওয়া, বা তাঁর কাছে আমার সমর্পন। গীতবিতান এর গান গুলোর সব ই নতুন ভাবে নতুন বোধ নিয়ে আমার কাছে উঠে এলো তা নয়, কিন্তু বঙ্কিমের গড় মান্দারনের সেই রহস্য মাধুর্য্য এর রস রাজ্য এর অপার অকৃত্রিম মধুরতা, সঞ্চয়িতার পাতার পর পাতা বিষ্ময়ের সাথে মিশে গিয়ে আমাকে রুশ উপন্যাস থেকে বুদ্ধদেব, শরৎ, শীর্ষেন্দু, সুনীল, দুলেন্দ্র সবাইকেই অন্তঃস্থ করতে সাহায্য করেছে।

এরপরে জীবনের সমস্ত ধাপে পদে পদে কখন কিভাবে যেন ওই বুড়ো লোকটা জুড়ে গ্যাছে।  শুধুমাত্র কাব্য করার জন্যে বলছিনা, বিশ্বের কাছে নিজেকে রবীন্দ্রপ্রেমী বলে প্রমান করার জন্যে নয়, একদম বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, নিজের সবথেকে কাছের সবথেকে প্রিয় মানুষটাকে হারিয়ে বারবার যখন গীতার মধ্যে শান্তি খোঁজার চেষ্টা করছি, তখন একদিন এমনিই কানে এলো আছে মৃত্যু, আছে দুঃখ, বিরহদহন লাগে। ..এর আগে কত বার শুনেছি ওই সুর, কিন্তু সেদিনের মতন ঐভাবে কোনোদিন যেন অন্তস্থ করতে পারিনি। সেদিন আরাবল্লী পাহাড়ে ঘেরা ছোট্ট সবুজ উপত্যাকাটার গেস্টহাউসে বসে মনে আছে মা বলেছিলো আচ্ছা এই গানগুলো কি আমাদের জন্যেই লেখা। আমরা মা মেয়ে সেদিন ওই সুর গুলোর মধ্যেই ধীরে ধীরে নিজেদের আস্তে আস্তে ফায়ার পেয়েছিলাম। যে অস্থিরতা আমাদের পারিপার্শিক কোনো কাজে মন বসাতে দিচ্ছিলনা, ধীরে ধীরে ওই সুরের প্রলেপ আবার আমাদের নিজ নিজ কর্মযজ্ঞে ফিরে যেতে সাহায্য করলো। তারপর দিন কেটেছে, কত ঘটনা, ঘটনাবলী, কত মানুষ , অভিজ্ঞতা আমাকে আমার বোধকে উন্নীত করে দিয়ে গেছে। কখনো আনন্দে মন উদ্বেল হয়ে গেয়ে উঠেছে, মম চিত্তে নীতি নৃত্যে,....আবার কখনো বা পারিপার্শিক আঘাত, অভিমান, প্রতিকূলতা আমাকে নিয়ে গেছে ছাদের কোণে , নিভৃতে গীতবিতান হাতে ফিরে পেয়েছি নিজেকে। দুজন মানুষ পাশাপাশি ই থাকুক বা থাকুক যোজন মাইল দূরে, মুখ যেখানে মৌন হয়ে, মন চায় মুখর হতে, সেখানে এই মানুষটার লেখনীর মাধ্যম ই অব্যক্ত বক্তব্য কে কতবার পৌঁছে দিয়েছে। মনের আবেগ তার আপন গভীরতায় যখন ভাষা হারিয়েছে, তখন বহুবার সেই অমিতর মতন কত লোককে বলতে হয়েছে, "বাণী দাও, বাণী দাও"...আমিও বলেছি, আশ্রয় নিয়েছি ওই লোকটার লেখনীতে। তাকে সেতু করে কখনো হয়েছে প্রেয়সীর সাথে চারিচক্ষুতে চাওয়ার ইচ্ছে। কখনো "সজনি সজনি রাধিকা লো
দেখ অবহুঁ চাহিয়া, পিনহ ঝটিত কুসুমহার, পিনহ নীল আঙিয়া। সুন্দরী সিন্দূর দেকে সীঁথি করহ রাঙিয়া।" শুনে লক্ষ দামামার শব্দ বেজে উঠেছে বুকে। কত "তৃষিতনয়ন ভানুসিংহ" হয়তো এখনো সত্যি ই কুঁচ্যপথে চেয়ে বসে আছে তার প্রেয়সী কখন জুঁই বেলি মল্লিকার ডালি সাজিয়ে আসবে তার জন্যে। কত প্রেমিক মন হয়তো আজকের দিনে বসেও বুনে চলে অজানা ভবিষ্যতের দিনে শান্তিনিকেতনের কোপাইকে সাক্ষী রেখে শান্তির নীড় রচনার স্বপ্নজাল। আর এই দাড়িওলা বুড়ো লোকটা যেন সেই প্রেমিক মন এর যুগলবন্ধীর মধ্যে সেতুবন্ধন করে কখনো খুঁজে দেয় আমাদের মধ্যের টগবগিয়ে ঘোড়ায় চড়া বীরপুরুষ বা গোড়ার উজ্জ্বল চরিত্র, কখনো বা সে অমিত এর মতো সৌখিনতার মোড়কে খুঁজে চলে কোনো লাবণ্যের সুনন্দিত রুচিশীল স্পর্শ অথবা যোগমায়ার মতন স্নেহময়ী মায়ের একটু ছোঁয়া।  
এখনও যখন কোনো ক্যানোর কোনো উত্তর পাওয়া যায়না, তখন মনে মনে আবৃত্তি করি "কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও, তার রাত নিত্যই উধাও/ জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন/ চক্র পিষ্টে আঁধারের বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন/ ওগো বন্ধু, সেই ধাবমান কাল জড়ায়ে ধৰিলো মোরে ফেরি তার জাল --"....এইভাবে রোগে, শোকে, দুঃখে, আনন্দে, প্রেমে, বিরহে কখন যেন কিভাবে সবকিছুর মধ্যে ওই সৃষ্টির মধ্যে আবর্তিত হতে থেকেছে আমাদের মন। শান্তি পেয়েছে তাতেই, আশ্রয় পেয়েছে তাতেই। অনন্য আনন্দে মন উঠেছে ভোরে, মনে হয়েছে "আনন্দধারা বহিছে ভুবনে" , কি ব্যাপ্তি, কি শান্তি আর কি অসাধারন বার্তা এর ছত্রে ছত্রে  যখন শুনি "বসিয়া আছ কেন আপন-মনে, স্বার্থ নিমগন কী কারণে।
চারিদিকে দেখ চাহি হৃদয় প্রসারি, ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি।
প্রেম ভরিয়া লহো শূন্য জীবনে।" সত্যি ই যেন এক পুণ্য ইচ্ছা এক মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে বোধিপ্রাপ্ত হই।   আর এমন করেই বহুবার বহুকারণে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি তে , নিজের ই দায়ে থমকে দাঁড়িয়েছি ওই অসীম সৃষ্টির সামনে, শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে গেছে বারবার। রবীন্দ্রনাথ হয়তো আমার প্রতিদিনের দৈনন্দিন জীবনের সাথে এক এবং অদ্বিতীয় ভাবে সচেতন ভাবে জড়িয়ে নেই, কিন্তু যখন চারপাশের অসহিষ্ণুতা, অপ্রীতিকর ঘটনা, অশালীনতা, চারপাশে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অপ সংস্কৃতীর হাত থেকে আমাদের বাঁচতে হয়, তখন ওই বিরাট মঙ্গলময় সৃষ্টি জলে স্নান করে নিজেকে স্নিগ্ধ করার জন্যে বারবার তাঁর কাছে ফিরে যেতে হয়। তাই বারবার হয়তো নিজের আমিত্ব কে রক্ষার জন্যেই, নিজের স্বার্থেই বারংবার তার কাছে ফিরে যাই, আর বলি "হে নুতন দেখা দিক আর বার জন্মের ও প্রথম ও শুভক্ষণ " যে মহাজন্ম আমাদের বিশ্বসংসার কে আলোড়িত করে তুলেছে, আমাদের প্রতিদিনের বোধ কে উন্নীত করেছে এক অমোঘ শুভ কামনা দিয়ে, আমাদের মানব জন্ম কে সার্থক করার এমন ইঙ্গিত, এমন মঙ্গল ময় শান্তির বার্তা যে দিয়ে গেছে , সে মহা আবির্ভাব ফিরে আসুক বারংবার। আমাদের প্রতিদিনের জীবনের সমস্ত অসুন্দরকে সুন্দর দিয়ে ভরিয়ে তুলি। নাহয় কল্পনার তুলিতে প্রকৃতির রঙে ডুবিয়ে তাকে জীবনের রূপ রস লাবণ্যে ভরিয়ে তোলার জন্যেই থাকো, কিন্তু থাকো আমাদের মর্মে, মননে , জ্ঞানে, অজ্ঞানে , সত্যি আর স্বপ্নে। 






GOd Help them who help themselves . ভগবান তাকেই সাহায্য করে, যে নিজে নিজেকে সাহায্য করে

 আমাদের জীবনে অনেক রকম phase আসে। আমি বিশ্বাস করি, এই প্রত্যেক মুহূর্তের নিজস্ব কিছু কারণ থাকে, কিছু purpose যা অনেক পরে আমরা বুঝতে পারি। কখ...