Tuesday, 3 November 2026

অপেক্ষা | পূনর্মিলন RUTH ও MINKA-র সত্য ঘটনা | জীবন থেকে নেওয়া জীবনের গল্প| the waiting

 এবছরের মতন দেবী দূর্গা ফিরে গেছেন কৈলাশে। অস্তমিত হয়েছে কোজাগরীর চাঁদ ও । দূর্গা পুজো আসলে মা মেয়ের গল্প , মেয়ের তার মা এর কাছে ফিরে আসা। আর এই স্বর্গ ও মর্ত্যলোকের কল্পনা কেমন যেন আমায় মনে করায় মা বাবাদের সেই চিরন্তন চাওয়া আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাত এ। মা বাবার কোল থেকে বড় হয়ে বৃহত্তর জগতে পদার্পন করে সন্তান যেখানে তার মতন করে তার জগৎ সংসার সামলাচ্ছেন কিন্তু মনের মধ্যে রাখা ছোট্টবেলার বেড়ে ওঠা গুলো ভীষণ যত্নে, ভীষণ আদোরে লালিত , দশদিক সামলিয়ে সবাইকে নিয়ে সেই ছোটবেলার চৌকাঠে পা রাখা বারবার। কিন্তু সবসময় সবার এই সৌভাগ্য হয়না,  সৌভাগ্য হয়না আর পাঁচ জনের মতোনা বেড়ে ওঠার বা এক ই ভাবে ফিরে যাবার, মায়ের বুকে বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ার। অনেকসময় কতজনে তাদের সান্নিধ্যে বড় হবার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়। এই পৃথিবী এক অদ্ভুত জায়গা। এখানে মানুষ নিজের কর্মে নিজের জায়গা তৈরি করে কিন্তু কোথাও সে বাঁধা থাকে অদৃষ্টের অদৃশ্য বন্ধনে। অদৃষ্টের সুতোয় কোথাও সে নীরবে , অদৃশ্যে নিয়ন্ত্রিত হয়ে চলে। কর্ম , কর্ম তো করতেই হবে। কর্মের জোড়েই আমরা নিজেরা নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যাই।  অদৃষ্ট আর কর্ম এর সংযোগ হলে হয়তো এমন কিছু ঘটে যা আপাত দৃষ্টিতে আমাদের মিরাকেল বলে মনে হয়। আজ শুনবো এমন ই এক অভাবনীয় ঘটনার। সত্যি ঘটনার কথা। শুনি রুথ লি এর কথা, রুথ লি, একজন ৭০ বছর বয়সী ভীষণ ই accomplished এক জন মানুষ। এক মা। ছোটবেলায় তিনি জানতেন যে তিনি দত্তক নেওয়া হয়েছেন, কিন্তু তা কখনোই কোনো আক্ষেপের কারণ হয়নি, দত্তক মা বাবার স্নেহে, তিন ভাই বোনের সঙ্গে আনন্দের সঙ্গে কেটেছে শৈশব, কৈশোর, যৌবন। বিয়ে করেছেন, এক একটি করে ৬ সন্তান এসেছে জীবনে। তারা প্রতিষ্টিত হয়েছেন জীবনে, তারা যেন এক একটি রত্ন, একজন আর্মিতে কর্নেল, একজন নাসার মহাকাশচারী হিসেবে চারটি মহাকাশ অভিযানে অংশ নিয়েছেন। বাকি সন্তানরাও নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মা এর সম্পর্ক ও ভীষণ সুন্দর। একজন মানুষের জীবনে আর কিছু কি চাওয়ার থাকতে পারে ? রুথ এর ও ছিলোনা, এত সুখী, সার্থক এক জীবনে কখনো নিজের সেই না দেখা জীবন তাঁর আসল মা বাবার খোঁজ নেবার তাগিদ কখনো অনুভব করেননি তিনি। কিন্তু ৭০ পেরোনোর পরে যখন একের পর এক অসুখ এসে হাসপাতাল আর বাড়ি করতে করতে তাঁর জীবন যখন একেবারে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, প্রাণ নিয়ে টানা পোড়েন তখন ডাক্তার রা বললেন, জেনেটিক সমস্যা হতে পারে, ভালো করে বুঝতে হলে আসল মা বাবার মেডিকেল হিস্ট্রি জানা দরকার। এডোপটেশন এর কাগজপত্র সন্তানকে দেখানোর নিয়ম থাকেনা, কিন্তু মেডিকেল গ্রাউন্ড এ আর্জি জানালে কিছু হতে পারে, রুথ এর একদম ইচ্ছে ছিলোনা আবার এই বয়সে এসে এত হাঙ্গামা করেন। কিন্তু ছেলেমেয়েরা কিছুতেই শোনেনা, তাদের জোরাজুরি তে অবশেষে অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাধ্য হয় রুথকে মেডিক্যাল গ্রাউন্ডে পিটিশন ফাইল করতে হল সরকারি অফিসে, যাতে তার অ্যাডাপশনের পেপার পাঠানো হয়। প্রত্যাশা ছিল না, ইচ্ছেও নয়! এলে আসবে! না এলে রুথের বয়েই গেছে! সেই তো পাঁচ পাতার ডকুমেন্টস!

কিন্তু যেটা এল, সেটা পাঁচ পাতার ডকুমেন্টস নয়। দুই পাউণ্ডের বিশাল বড় একটা পার্সেলে দু'শোরও বেশি ফাইল! কেস নম্বর ৩৫৯ এর অজস্র দস্তাবেজ, আইনি নথি, ফটোগ্রাফ আর ছবি এসে হাজির হল রুথের কাছে। আর তার সঙ্গে এল অজস্র চিঠি। চিঠি, যা বছরের পর বছর ধরে এসে জমেছে 'হাউস অফ মার্সি'র দপ্তরের আর্কাইভে। চিঠিগুলো সব একজন নারীরই লেখা। তার নাম মিনকা ডিসব্রো। রুথের জন্মদাত্রী মা।
সে সব চিঠি পড়ে অভাবনীয় ঘটনার কথা জানা গেল, ইতিহাসে সেরকম ঘটনা প্রায় নজিরবিহীন। আবহমান অপেক্ষার এক অকথিত কাহিনী, যা হয়তো আরেকটু হলে অজানাই থেকে যেত আমাদের কাছে। প্রায় একশো বছর আগের কথা। নেদারল্যান্ডস থেকে আসা বহু অভিবাসী তখন নতুন করে জীবন গড়ার আশায় বসতি স্থাপন করছিলেন সাউথ ডাকোটার বিভিন্ন অঞ্চলে। সেখানে গড়ে উঠছিল একের পর এক ডেয়ারি ফার্ম। কিন্তু নতুন দেশে বসবাস শুরু করলেও তাঁদের জীবনযাত্রা, সংস্কার আর সামাজিক অভ্যাসে পুরোনো দেশের ছাপ তখনও স্পষ্ট। বাইরের সমাজের সঙ্গে সহজে মিশে ওঠা হয়ে উঠত না অনেক পরিবারের পক্ষেই। তাঁদের ছেলেমেয়েরাও তাই নিজেদের পরিচিত গণ্ডির মধ্যেই থাকতে অভ্যস্ত ছিল।

এমনই এক অভিবাসী পরিবারে জন্ম মিনকার। ছোটবেলায় তারও ইচ্ছে ছিল স্কুলে পড়াশোনা করার, কিন্তু সংসার আর খামারের কাজের প্রয়োজনে বেশিদিন সেই সুযোগ পায়নি সে। পরিবারের কাজে হাত লাগাতে গিয়ে অল্প বয়সেই পড়াশোনায় ইতি টানতে হয় তাকে।

মাত্র ষোলো বছর বয়সে মিনকার জীবন যেন বাঁধা পড়ে গিয়েছিল খামারের দৈনন্দিন রুটিনে। সকাল থেকে সন্ধ্যা—কাজ আর দায়িত্বের বাইরে আলাদা করে নিজের জন্য সময় বলতে বিশেষ কিছুই ছিল না। তবে দুপুরের একটা ছোট্ট সময় ছিল একান্ত তার নিজের। সেই সময়টুকুতে বান্ধবীদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ত সে, কখনও বনের পথে হাঁটত, কখনও গাছপালায় ঘেরা নির্জন জায়গায় বসে গল্প করত।

বয়ঃসন্ধির সেই দিনগুলোতে বাস্তবের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মনে কত রকমের স্বপ্ন যে ভিড় করে আসে! এমন সব স্বপ্ন, যেগুলোকে হয়তো নিজেরাই অসম্ভব বলে জানি, অথচ মন থেকে সরিয়ে রাখতে পারি না। অজানা ভবিষ্যতের প্রতি কৌতূহল, অন্য রকম জীবনের আকাঙ্ক্ষা, আর একদিন নিজের মতো করে বাঁচার ইচ্ছে—এসবই ঘুরেফিরে আসত তাদের কথায়।

দুপুরের সেই অল্প সময়টুকুতে বান্ধবীদের সঙ্গে মনের কথা ভাগ করে নিত মিনকা। খামারের চারপাশে সীমাবদ্ধ জীবন থেকে দূরে, সেই মুহূর্তগুলোতেই যেন সে একটু অন্য রকম পৃথিবীর স্বাদ পেত। কিন্তু সে তখনও জানত না, সামনে এমন এক সময় অপেক্ষা করছে, যা তার কিশোরী জীবনের সমস্ত পরিচিত হিসেব বদলে দেবে। এমন ই দুপুরে একদিন হটাৎ করে মিনকা আর তার বান্ধবী শিকার হয় তিনজন পুরুষের লোভের। কিশোরী জীবনের সেই নরম সুন্দর স্বপ্ন গুলোকে এক নিমেষে ভেঙে চুরমার করে দেবার জন্যেই যেন তাদের কাছে এসেছিলো কাউবয় টুপি পড়া কিছু অমানুষ, ভালো করে মুখ ও দেখতে পায়নি তাদের ওরা আর সন্ধ্যে বেলায় বাড়ি ফিরে নিজেদের জীবন তছনছ হয়ে যাবার এই ঘটনাও কাউকে বলতে পারেনি। তাছাড়া বলবেই বা কাকে, চিরকাল ই সমাজে এমন ঘটনায় মেয়েদের সহানুভূতির থেকে দোষারোপ ই শুনতে হয় বেশি, আর সেই সময়কাল যখন শতাব্দী আগের, তখন যে একথা বলা কতটা কঠিন তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। কিন্তু বেশিদিন চুপ করে থাকতেও পারেনি সে, গর্ভলক্ষন দেখা দিতেই বাড়ি, পারিপার্শিক, মা সবার প্রশ্নবানে জর্জরিত সেই ষোলো বছরের কিশোরী তার জীবনের সবথেকে কালো দুপুরের কথা বলতে বাধ্য হয়। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে, abortion এর আর সুযোগ নেই, উপায়ান্তর না দেখে অসহায় পরিবারটি তখন দ্বারস্থ হয় লুথেরান চার্চ এর, যদি কেউ জন্মানোর পরে সেই নবাগত সন্তান কে দত্তক নিতে রাজি হন। চার্চের হাউস অফ মার্সি সংগঠনের মাধ্যমে এক সহৃদয় ধর্মযাজক ও তাঁর স্ত্রী সেই নবাগত কে দত্তক নিতে রাজি হলেন। মিনকার বয়স তখন সতেরো। পরিবারের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ ছিল না।

১৯২৯ সালের মে মাসে মিনকা একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দিল। মিনকার বয়স তখন ১৭. আইনি নথিতে মেয়ের নাম রাখা হলো বেটি জেন। শিশুটিকে নিজের কাছে রাখার কোনো পরিকল্পনা মিনকার ছিল না। বরং পুরো গর্ভাবস্থায় সেই দিনকার সেই ভয়াবহ ঘটনার স্মৃতিই তাকে তাড়া করে ফিরেছে। সে ভেবেছিল, সন্তানটিকে দত্তক দিয়ে দিলেই হয়তো জীবনের সেই দুঃসহ অধ্যায় থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু শিশু টিকে তার কোলে দেবার পরেই সবকিছু যেন কেমন এলোমেলো হয়ে গেলো। গোলাপি গাল , তুলোর মতন নরম চুল, অবাক বিষ্ময়ে মাথা ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখা। সেই অবাক দৃষ্টি, সে দৃষ্টির মধ্যে যে কি ছিল। বুকে জরিয়ে ধরলো তাকে মিনকা , এই ছোট্ট শিশুটার কাছে সেই শুধু সেই একমাত্র পৃথিবী, আর সে কাউকে জানেনা কিছুনা, আর কি নিশ্চিন্তে তার কাছে ঘুমিয়ে পড়লো শিশুটা। থরথর কেঁপে উঠলো মিনকার সমস্ত শরীর যেন , আনন্দে, বিষ্ময়ে, নিজের কাছে সম্পূর্ণ অজানা এই অনুভূতি তার। কি এই অনুভূতির মানে, এই কি প্রেম? এই কি ভালোবাসা, কিন্তু আর পাঁচজন নারীর জীবনে যেমন ভালোবাসায় , সম্মানে , আদোরে সন্তান আসে, তার সন্তান তো সেভাবে আসেনি, গর্ভাবস্থায় প্রতিটা দিন তো তার কেটেছে ভয় এ, দুশ্চিন্তায়, গঞ্জনায় , তাহলে তবুও কেন সে এমন বোধ করছে, এই নিশ্চিন্ত সমর্পন ই কি তার কারণ অথবা হয়তো তার স্বপ্ন দেখা কল্পনা প্রবন মন যা কিশোরী জীবনে সংসারের স্বপ্ন এঁকে দিয়েছিলো, এ সেই স্বপ্নের ফসল। তার মনে হলো, বেটি যেন তার মেয়ে নয়, এ যেন তার মা, জন্ম জন্মান্তরের যেন এই বন্ধন। মনে হলো সে শুধু এই মেয়েকে নিয়েই সারাজীবন কাটিয়ে দেবে, কিন্তু বাস্তব এসে সামনে দাঁড়ালো, আজকের দিনেও যা সমাজ মেনে নেয়নি, তা সেই উত্তাল সময়কালে আরোই ভাবনার বাইরে ছিল। প্রথম যুদ্ধ শেষ হয়ে দশটি বছর হয়েছে সবে, পৃথিবী তখন ও উত্তাল, প্রহর গুনছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। চারিদিকে অভাব, দারিদ্র, মহামারী। অস্থির এক সময়, এমন এক সময়ে এক অবিবাহিত মেয়ে তার মেয়েকে নিজের কাছে রাখলে সেই মেয়ের জীবন ও ওই এক খামার চক্রে শুরু ও শেষ হবে হয়তো। না না , এমন সোনার টুকরো মেয়ে তার, হয়তো তার কাছে না থাকলেই তার ভালো হবে, একটি মাস ধরে, অনেক যুদ্ধ চললো সেই সদ্য মাতৃত্বের স্বাদ পাওয়া মেয়েটীর মনে, অবশেষে আগের কথা মতন তুলে দিলো তাকে সেই দত্তক মা বাবার হাত এ। তুলে দিলো, নিজের জীবন ও চলতে লাগলো, পৃথিবী চলতে লাগলো তার নিজস্ব ছন্দে, ১৯২৯ থেকে ২০০৬ এর মধ্যে ঘটে গেছে কত কি, প্রথম উড়োজাহাজ থেকে পেনিসিলিনের আবিষ্কার, কম্পিউটারের বিকাশ তিনি সাক্ষী থেকেছেন , সাক্ষী থেকেছেন বিজ্ঞানের অগ্রগতি আর প্রযুক্তির অভাবনীয় পরিবর্তনের । দেখেছেন শেয়ারবাজারের ভয়াবহ পতন ও মহামন্দার দিনগুলি, দুই বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা, এমনকি মহাকাশযানের মর্মান্তিক দুর্ঘটনাও। কিন্তু পৃথিবীর এত পরিবর্তন, এত উত্থান-পতনের মধ্যেও তাঁর মনের গভীরে একটি আকাঙ্ক্ষা কখনও ম্লান হয়নি। যে সন্তানকে একদিন পরিস্থিতির চাপে নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে হয়েছিল, তার জন্য প্রার্থনা করা তিনি কখনও থামাননি। মিনকা জানতেন না, তাঁর মেয়ে কোথায়, কেমন আছে। তবু বেটি জেনকে ভুলে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি নিয়মিত চিঠি লিখতেন ‘হাউস অফ মার্সি’-তে। জানতে চাইতেন, বেটি কি স্কুলে যাচ্ছে? পড়াশোনায় কেমন? নতুন বাবা-মা তাকে কী নামে ডাকেন? জন্মদিন কীভাবে কাটে তাঁর আদরের মেয়ের? প্রতিষ্ঠানটি উত্তর দিত না—নিয়মও ছিল না উত্তর দেওয়ার। কিন্তু মিনকা চিঠি লিখে যায় নিজের মতো! প্রতি সপ্তাহে, প্রতি মাসে এই চিঠি এসে জড় হতে থাকে 'হাউস অফ মার্সি'তে। বছরের পর বছর ধরে। কখনও নিজের জীবনের কথা লিখেছেন, কখনও পাঠিয়েছেন পরিবারের ছবি, পোস্টকার্ড কিংবা ছোটখাটো স্মৃতিচিহ্ন। এর মধ্যে মিনকার বিয়ে হয়েছে, নিজের আরেকটি মেয়েও হয়েছে। তার বড় বড় নীল চোখ আর সুন্দর চুল দেখে বেটির কথা মনে পড়েছে,  চিঠিতে লিখেছেন, বেটি জেনের মতো সুন্দর আর কেউ নয়! মেয়েকে হারানোর প্রায় আঠারো বছর পর, ১৯৪৭ সালেও মিনকার অপেক্ষা ফুরোয়নি। তিনি লিখেছিলেন, “দয়া করে বেটির খবর পেলে জানাবেন। আমি অপেক্ষায় আছি। অপেক্ষা করব, অপেক্ষা করে যাব!”
এরপর আর কোনো চিঠি আসেনি। কিন্তু অপেক্ষা থামেনি।
মিনকা বিভিন্নভাবে মেয়ের দত্তক নেওয়ার নথি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু জানতে পারেনি কিছুই। তাঁর অজানাই থেকে গিয়েছিল, ছোট্ট বেটি জেনের নতুন নাম হয়েছে রুথ লি। প্রতি বছর ২২ মে, বেটির জন্মদিনে, মিনকা তাঁর কাছে থাকা মেয়ের একমাত্র ছবিটির দিকে তাকিয়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতেন—তাঁর মেয়ে যেন ভালো থাকে, সুখে থাকে। এদিকে বেটি জেন ওরফে রুথ লি এর জীবন চলেছে তার নিজস্ব ছন্দে, তার পক্ষে জানা সম্ভব ই নয় যে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে তাঁর জন্মদাত্রী প্রতিটি জন্মদিনে তার জন্য প্রার্থনা করছেন। ২০০৬ সালে, রুথের বয়স যখন ৭৭, আর মিনকার ৯৪, তখন ঘটল সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা। বেটি ওরফে রুথ লি যখন কেস ফাইল সহ চিঠিগুলো পড়তে শুরু করল, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। স্তম্ভিত হয়ে রুথ দেখল, তার আসল মা প্রায় অনন্তকাল ধরে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে। কিন্তু সেটা হবে কী করে? হিসেব মতো তার যদি ৭৭ হয়, মিনকার বয়স তো নব্বই পার করে গেছে! সে কি আর বেঁচে আছে? তাও একটা ক্ষীণ আশা নিয়ে ব্যাপারটা ছেলেমেয়েদের জানাল রুথ।
রুথের ছেলে ব্রায়ান দত্তক নেওয়ার নথি থেকে মিনকার জন্মতারিখ, নাম এবং অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করল। এরপর বিভিন্ন সূত্র ধরে খুঁজতে খুঁজতে একসময় তার নাম ও ফোন নম্বর পাওয়া গেল।
Minka Disbrow. Birthdate: November 10, 1911. Age: 94 years
এই নামটা পাওয়ার পর অবশ্য রুথের সাহস হয়নি ফোনটা করার। অ্যাস্ট্রনট ছেলেকে ফোনটা দিয়ে দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করে রইল সে। ফোন বাজল। অপর প্রান্তে এক বৃদ্ধা ফোন তুললেন। রুথ লির কথা শুনে ফোন রেখে দিচ্ছিলেন, কিন্তু ছেলে তাকে ফোন না কাটার অনুরোধ করে কথা চালিয়ে গেলেন। রুথ অবশ্য কিছুই শুনতে পাচ্ছিল না। সে স্থাণুবৎ বসেছিল ছেলের সামনে। এমন সময় ছেলে তার দিকে রিসিভার বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "কথা বলো মা!"
"কে?"
"তোমার মা! আসল মা! সারাজীবন ধরে উনি তার মেয়ের জন্য অপেক্ষা করে আছেন। বেটি জেন...মানে তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছেন।"
রুথ কাঁপাকাঁপা হাতে ফোন তুলে বললেন, "আমি... আমি তোমার বেটি জেন!"
ফোনে মা-মেয়ের প্রথম কথা কীভাবে শুরু হয়েছিল, তার প্রতিটি শব্দ হয়তো আজ আর কারও মনে নেই। কিন্তু সেই ফোনকলের মধ্য দিয়েই প্রায় ৭৭ বছরের বিচ্ছেদের অবসান ঘটল। এই ফোন কলের দু মাস পর মা মেয়ের দেখা হয়েছিল।একজনের বয়স ৭৭, অন্যজনের ৯৪। যে মেয়েকে মিনকা এক মাস বয়সে দত্তক দিয়েছিলেন, সেই মেয়েই এখন সাদা চুলের বৃদ্ধা। এত বছর ধরে মেয়ের যে মুখটি তিনি কল্পনা করে এসেছেন, বাস্তবে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মিনকা, রুথের সাদা চুলে হাত বুলিয়ে পরম বিস্ময়ে বলেছিলেন, "আমার মেয়েটা বুড়ি হয়ে গেল কী করে?"
এরপর মা-মেয়ের সম্পর্ক নতুন করে গড়ে উঠল। তাঁরা একে অপরের জীবনের গল্প জানলেন, পরিবারের সঙ্গে পরিচিত হলেন, হারিয়ে যাওয়া সময়ের কিছুটা হলেও ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করলেন। মিনকা তার মেয়ের ছয় সন্তানকেও জানার সুযোগ পেলেন। তাদের মধ্যে একজন মার্ক সি. লি (Mark C. Lee) যে নাসার মহাকাশচারী, একাধিকবার মহাকাশ অভিযানে গিয়েছেন, সেটিও তার কাছে ছিল এক বিস্ময়কর খবর।
২০১৪ সালের ১৮ জুন, ১০২ বছর বয়সে মিনকা ডিসব্রো মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি তার হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে ফিরে পেয়েছিলেন। যে মেয়ের জন্য প্রায় আট দশক ধরে অপেক্ষা করেছেন, অন্তত জীবনের শেষ কয়েকটি বছর তার সঙ্গ পাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
মিনকার নাতনি ক্যাথি লার্গো তার দিদার জীবনের এই অসামান্য গল্প নিয়ে লিখেছেন The Waiting বইটি। বইটির সহলেখক সিন্ডি কোলোমা। প্রকাশক Tyndale Momentum। ইচ্ছে হলে পড়ে নিতে পারেন। আর কিছু না হোক, এইটুকু বিশ্বাস জন্মাবে যে, মিরাকল বলে বিষয়টা পৃথিবীতে আজও ঘটে! আর এই পৃথিবীটাকে আবারো ভীষণ ভালোবাসতে ইচ্ছে করবে। কেমন যেন প্রার্থনা, বিশ্বাস এই শব্দ গুলোর ওপরে আর একবার নতুন করে ভরসা করতে ইচ্ছে করবে। বুঝতে পারবো ভাগ্য আমাদের চালিত করে যেমন তেমন আমাদের প্রার্থনা, বিশ্বাস, তার প্রতি ডেডিকেটেডলি পরিবর্তে কি পাচ্ছি না পাচ্ছি সেই সব হিসেব না করে শুধু জুড়ে থাকার শক্তি নতুন করে ভাগ্যকে গড়ে তোলে, আর তখন ই তা আমাদের ভীষণ সাধারণ জীবনে নিয়ে আসে মিরাকেল। ম্যাজিক।

এক অপেক্ষার, পুনর্মিলনের। ডেডিকেশন , কমিটমেন্ট এর। মিরাকেল এর মতন। আশ্চর্য্য হয়ে যাই যা চিন্তা করলে, অভাবনীয় হয়ে অবাক হয়ে ভাবি, এমন ঘটনা ও হয়, আর যার সঙ্গে সেই ঘটনা হয়, সে কি ভাবে? তার ভাগ্য তো সত্যি ই নিয়ন্ত্রিত হয় অদৃষ্ট বলুন , ঈশ্বর বলুন, অদৃশ্য কোনো শক্তি যাই হোক সে, যে রূপেই মানুষ তাকে গ্রহণ করুক, তার অদৃশ্য চালনে , আমরা জানতেও পারিনা। আজ শুনবো এমন ই এক অভাবনীয় ঘটনা, যেখানে অদৃষ্টের অদৃশ্য চালনা অজানা ছিল, কিন্তু ভালোবাসা, কমিটমেন্ট আর এক ই কাজের প্রতি লেগে থাকা ডেডিকেশন কিভাবে সন্তানকে তার জন্মদাত্রী এর সঙ্গে মিলিয়ে দিতে পারে। ৭৭ বছর পরে ফিরে পাওয়ার এক অনন্য ঘটনা। cathey Lagro এর লেখা The Waiting বই এর থেকে নেওয়া  সত্যি ঘটনা। 



অপেক্ষা | পূনর্মিলন RUTH ও MINKA-র সত্য ঘটনা | জীবন থেকে নেওয়া জীবনের গল্প| the waiting

 এবছরের মতন দেবী দূর্গা ফিরে গেছেন কৈলাশে। অস্তমিত হয়েছে কোজাগরীর চাঁদ ও । দূর্গা পুজো আসলে মা মেয়ের গল্প , মেয়ের তার মা এর কাছে ফিরে আসা। আ...