Thursday, 2 August 2018

মাছরাঙা

একটা ছোট্ট মাছরাঙা, যার ডানার ভেতরটা নীল, গাঢ় নীল রঙের। যখন উড়ে যায়, তখন সেই নীল, গাঢ় , মনভোলানো নীল রং চোখে পরে। আর যতক্ষণ কাছে থাকে, যেন চুপ করে ধ্যানমগ্ন হয়ে থাকে সমস্ত অনুক্ষণ। আমার কাছের সময়, যে সময়টা আমরা পেরিয়ে চলেছি, হটাৎ হটাৎ করে যেন সব ভাষা হারিয়ে ঐরকম ধ্যানমগ্ন হয়ে যায়। কথা ছিল কি? বলার ছিল কিছু? ছিল কি কিছু টানা পোড়েন ? কিছু বোঝাপড়া? হিসেব? ছিল হয়তো, কি এসে যায় তাতে। সেইসব জটিলতা, ওই ভরাগঙ্গার জোয়াড়ে যেন কোথায় ভেসে চলে গেল। মনে এলোনা আর। শুধু মনে হলো, এই ক্ষন, এই একটা একটা মুহূর্ত যেন ওই ভরা বর্ষার যৌবনমতী ধরিত্রীর মতো খুব স্নিগ্ধ, সবুজ হয়ে, তার সমস্ত আকুলতা নিয়ে বয়ে চলেছে। সেই আকুলতা কখনো কখনো অবোধ ইচ্ছে হয়ে ঢেউ তুলে দিয়ে যায় , আবার কখনো কখনো শিশুর আবদারে আদুরে নরম দুপুরের মতো হয়ে ছায়া চায়। সেই চাওয়া, সেই আকুলতাকে স্নেহে জড়িয়ে রাখা যায় কিন্তু ভুল বোঝা যায়না। 
আমার সেই চেনা মাটির গন্ধটা যেদিন থেকে পেয়েছি, সেদিন থেকেই এই চেনা আকাশ আমাকে প্রাণ ভরে বৃষ্টির শব্দ শুনিয়েছে। সেই বৃষ্টিতে চারপাশের চিরপরিচিত ছোট খাটো খাল বিল নদী সবাই যেন নবযৌবন ফিরে পেয়েছে। সেই নবযৌবনমতী নদীকে আজ কাছে থেকে দেখার কিছু মুহূর্ত এলো বীরপুরুষের হাত ধরে, ঘোড়ায় চড়ে। প্রাণ ভোরে দেখলাম সেই ভরা গঙ্গার উথাল পাথাল আজ নেই। ভাঁটা তো নয়, জোয়ার চলছিল যে...তাও , দুকূল ছাপিয়ে বয়ে চলা স্রোতসিনী কেমন ভাব গম্ভীর হয়ে বয়ে চলেছিল। চলার বোধেই শুধু নয়, যেন পরম মমতাতেও , চারপাশের সমস্ত কিছুকে বুকে করে নিয়ে এগিয়ে চলেছিল। সেই ভেসে চলা কচুরি পানা , আরো কত হাজারো জঞ্জাল, যাকে দেখে আমরা দূরে সরে যাই, নদী  কিন্তু তাকে ফেলে দেয়না , তাকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলে, আবার নতুন স্রোতে মুছিয়ে দেয় পুরোনো সব গ্লানি। আবার ভেসে চলা। চলার নিয়মে। 
সেই ভেসে যাওয়া, কিরকম যেন অদ্ভুত ভাবে আমার চারিদিকে ঘোর তৈরি করতে লাগলো। চিরপরিচিত হাওড়া ব্রিজ আর হুগলী সেতুকেও নতুন লাগছিলো। কেন লাগছিলো জানিনা, এখন সেটা খুঁজবোওনা। তবে ওই নদী যেন ওই মাছরাঙার হাত ধরে আমাকে কিছু কথা বলে গেল,  যেন কিছু মুহূর্ত তৈরি করে দিয়ে গেল। আর যেন বলে গেল যে আমাদের চারপাশে তৈরি হওয়া প্রতিটা মুহূর্তকে গ্রহণ করতে। প্রত্যেকটা মুহূর্ত আলাদা আলাদা গন্ধ নিয়ে আসে। এর ই নাম কি মুহূর্তে বাঁচা? কিজানি। জানিনা। তবে ওই যে আজ আবার সেই কথা কটা মনে হলো, আমাদের নিজেদের ইচ্ছেতে তো এই সংসারে গাছের একটা পাতাও নড়েনা , তাহলে কেন আমরা মিছেই ভেবে মরি। সময়ের সাথে সাথে যা চলে যাবার, তা ঐরকম ই ভেসে চলে যাবে। চাইলেও যাবে, না চাইলেও। আবার যা আসার তা আপনি সঙ্গে থেকে যাবে। জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গি ভাবে কখন জড়িয়ে যাবে। কিভাবে, আমরা তা এতটুকু টের ও হয়তো পাবনা। আপনা হতে আমার সব ভাবনা কোথায় হারিয়ে যেতে চাইলো। কঠোরতার হাত ধরে কখনো তাকে জোড় করে ধরে রাখার চেষ্টা ও করলাম বা। তারপর একসময় সবকিছু কেমন স্থির শান্ত হয়ে গেল। বৃষ্টিভেজা পৃথিবীতে ঘোর লাগলো আবার। কথা তখন বাহুল্য হয়ে গেল। ভাষা পেলোনা তার ঠিক সুরটা। কথা বললেই তখন তা মনের সমস্ত ভাবকে গোপন করে শুধু রোজকারের রোজনামচা হয়ে যাচ্ছিলো। তাই শব্দ কে ছুটি দেওয়া হলো। সামনে তখন শুধু একটানা ভেসে চলার আহ্বান। মাথার ওপরে শঙ্খচিলের উড়ে চলা। ভেসে যাওয়া ডিঙি নৌকার স্বপ্ন দেখার হাতছানি। আর ভরা গঙ্গার মমতা মাখানো মৃদু হাসি। 












Sunday, 22 July 2018

জুঁই ফুল

কত্তদিন কিছু লেখা হয়নি। আজ এই দুপুরবেলায় হটাৎ ভীষণ খুব লিখতে ইচ্ছে করছে। না, লেখিকা আমি নই , তবু এতদিন পরের এই বাদল বাতাস , ভিজে ভিজে এই হাওয়া , সারাদিন ধরে অঝোর ধারায় বৃষ্টির শব্দ মনের মাঝে অদ্ভুত কি এক সুর তুলেছে, যাকে বর্ণনা করার জন্যে সঠিক ভাষা পাওয়া যায়না, তবু মনে হয়, এমন ও দিনের দুপুরবেলাটাতে ও কি শুধু কাজ কাজ করে থাকা যায়। মনে হয় কি হবে এই এতো কাজ করে। 
একটু আগে আমার পঁয়ষট্টি পেরোনো বড়মাসী ফোন করেছিল, তার আদরের বোনঝি কে নিয়ে জানালার ধারে বসে বসে দুছত্র লিখেছিলো, শোনাতে ইচ্ছে হয়েছিল। কিন্তু বোনঝি সেটিও মন দিয়ে শুনতে পারলোনা, কারণ ওই কাজ। গতকাল রাত্রে পিসি ফোন করেছিল, তার কামিনী ফুলের গাছ ফুলে ফুলে ভোরে গেছে , সেই কথাটাও এই ভাইঝি কে না জানালে কি করে হয়, কিন্তু ভাইঝি টি যে পাঁচ মিনিট ও বার করতে পারেনা ওই পিসির জন্যে, যে পিসির সঙ্গে ছোটবেলাতে কত মেলা দেখেছে, রথ , চড়ক, পুজোর মণ্ডপ। শ্বশুর বাড়িতে সব থেকে আদর পায় যে মানুষ দুজনের কাছে, সেই ব্যাপী আর মামনির জন্যেও রাখা আছে অনেক গল্প। কিন্তু তার আগেও নাকি কাজ শেষ করা দরকার। 

আজ এই জলে ভেজা সবুজ হয়ে যাওয়া পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে নিজেকে নিয়েই যেন অনেক প্রশ্ন উঠছে। মনে হচ্ছে তাহলে কি খুব যন্ত্রের মতো হয়ে যাচ্ছি আমরা। সত্যি ই কি এই এত কাজের কোনো প্রয়োজন আছে। ডেডলাইন এর পরে ডেডলাইন। কি হবে যদি সব ডেডলাইন মিস ই করি। কেমন হয় যদি এখন চুপ করে বসে শুধু বৃষ্টি ই দেখি। বা মাসির লেখা কবিতা শুনি বা প্রাণ ভোরে নি পিসির কামিনী ফুলের গন্ধে। অথবা এই যে আজ সবাই কেমন তৃপ্তি করে আমার হাতের রান্না খেলো, এটা দেখাও কি কম সৌভাগ্যের। নিজের মানুষদের কাছে বসিয়ে যত্ন করে খাওয়ানো, তাদের রসনা তৃপ্ত মুখের পরিতৃপ্ত হাসি দেখতে পাওয়া, এও কি কম পাওনা। 

হয়তো খুব সেকেলে, বোকা বোকা কিছু সেন্টিমেন্ট আগলে রেখে চলেছি আমি। হয়তো এই যে কাজে ফাঁকি দিয়ে এইসব আবোলতাবোল লেখার মধ্যে দিয়ে করছি সময়ের অপচয়। তবু, করিনা, কি হবে। আমি যে ভালোবাসি। সবকিছু ভালোবাসি। যেমন ওই যখন আমি ল্যাব এ ঢুকি, তখন ল্যাব এর ওই চিরপরিচিত গন্ধটা আমাকে ঘোর লাগায় , তেমন ই যে এই সিক্ত সবুজ পৃথিবী আমাকে ঘোর লাগায়। চারিদিকের এই ভিজে ভিজে নরম সবুজ সিক্ত পৃথিবীটা কে যত দেখি তত যেন মনের মধ্যে চলা সব ঝড় শান্ত, স্থির হয়ে যায়। কারোর সাথে কোনো কথা কাটাকাটি, ঝগড়া, কথার খেলা খেলতে আর ইচ্ছে করেনা। শুধু মনে হয় শান্ত হয়ে চুপ করে বসে কেউ আমাকে আমার মতো করে বুঝে নিক, জেনে নিক, আর আমি শুধু তার কথা শুনি। কোনো তর্ক নয়। কথার পৃষ্ঠে কথা নয়। জটিলতা নয়। গ্লানি নয়। শুধুই তার কথা শুনি, একেবারে চুপ করে বসে। চারপাশের সমস্ত জটিলতা, না পাওয়াকে দূরে সরিয়ে দুহাত ভোরে শুধু একরাশ ভালোলাগা কে আগলে রেখে , চারপাশের সব ভালোটুকুকে এক করে শুধু ভালোবাসা গাঁথা হয়ে থাক। 

একটা ভিজে হাওয়া এসে ঘরের পর্দা গুলোতে ঢেউ তুলে দিয়ে গেল। আজকে আবার জুঁই ফুলের মালা দিয়েছি ঠাকুরের কাছে, গোটা বাড়িতে ভেসে বেড়াচ্ছে জুঁই ফুলের গন্ধ  ওই যে আমার ঠাকুর, যে সব সময় আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে, কি জানি তার মনে কি আছে। ওই গন্ধ, এই বৃষ্টির শব্দ, এই ভিজে হাওয়ার মধ্যে দিয়ে সবকিছু এলোমেলো করে কি বার্তা পাঠাচ্ছে , কি জানি। তবে জানি, এলোমেলো করার জন্যে নয়, সব কিছুকে সুন্দরতা দিয়ে সাজিয়ে দেবার জন্যেই তার সব আয়োজন। 

খুব ইচ্ছে করছে, বৃষ্টি ভেজা একমুঠো জুঁই ফুল আলাদা করে, সংগোপনে, সযতনে তুলে রাখতে। 


Saturday, 30 June 2018

আজকে চলো ঝগড়া করি / এক চুমুকে কফির কাপ এ / আজ নাহয় বুঝলেই ভুল / নাহয় হলাম আমি বড্ডো নিঠুর

এই যে ছিল মনখারাপের মেঘলা আকাশ
এইতো আবার মেঘ সরিয়ে উঠলো হেসে
বললো আমায়
এই মেয়ে তুই বৃষ্টি খুঁজিস
আমার কাছে।
আমি বললাম, খুঁজছি ই তো -
আকাশ জুড়ে বৃষ্টি নামুক ,
ঝাপসা চোখে ঘোর লেগে যাক
থাকুক সে ঘোর সারাজীবন
তোমার আমার সবার মাঝে।
ভাসিয়ে নাহয় দিক রোজকারের ওই ব্যাস্ততাটা ,
শুধুই তখন কাব্য করি
কাঁচের দেওয়াল
বৃষ্টি মাখি।
আকাশ তখন উঠলো হেসে ,
বললো ইশ সখ কত তোর ,
ওসব গল্পে তেই লাগে ভালো।
আসল সময় অন্য রকম
সব ই শুধুই সাদা কালো।
খুব একচোট ঝগড়া করলাম
দুষ্টু ওই আকাশ টাকে
অনেক করে দিলাম বকে।
সত্যি হোক মিথ্যে হোক
হোকনা এসব  গল্প কথা
নাহয় স্বপ্ন দিয়েই সাজানো হলো
এ জীবন নাহয় হলোই আমার স্বপ্নকথা।
তবু তো প্রাণ পাবে সে
সবুজ রঙে করবে স্নান
নীল আকাশে ভাসিয়ে ভেলা
গাইতে পারবে প্রাণের গান
দেখবে তখন বৃষ্টি নামছে
যখন তখন, ইচ্ছেমতন।
উঠছে চাঁদ, জাগছে আকাশ
ঝকঝকে দিন, সবুজ ভোর।
একটু কথা অনেক হাসি
মন খুলে চল ভালোই বাসি
বৃষ্টি মাখা বকুল ফুলে
হাঁটবো পথ মনের ভুলে
পাগলপারা গন্ধরাজে আকাশ তুমি ভুলবে তখন
এখন নাহয় ঝগড়া করো
দেখবো কেমন ঘোর না লাগায় ,
ওই জ্যোৎস্না মাখা সবুজ বন।


Tuesday, 19 June 2018

সখ্যতা

নাম হীন যেকোনো কিছুই আমাদের ভাবনায় ফেলে। নামহীন, গোত্রহীন কোনো কিছুকে কোনোদিন ই আমাদের বুদ্ধি, আমাদের বিবেচনা মেনে নেয়না। আর তাইতো যত ক্ষুদ্র ই হোকনা কেন, সেই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণী হোক বা আগাছা হোক, তাকে ধরে বেঁধে যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো গোত্রভুক্ত করা হচ্ছে, ততক্ষন পর্যন্ত শান্ত হতে পারিনা আমরা। সে প্রাণী হোক কি উদ্ভিদ,  কি হোক কোনো নামনা না জানা কোনো জায়গা, নাম তার চাই। অজানাকে জানার নেশায় আমরা ভালোবাসি অচেনা কে চেনা করে নিতে। আর তাই পরিচয় সম্পূর্ণ করার জন্যে সবার আগে করতে বসি নামকরণ। আর সেই নামকরণের নেশা, পেশা হয়ে আমাদের মতো কত অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনামী ভাবি বৈজ্ঞানিক দের বৈজ্ঞানিক হয়ে ওঠার পথে প্রথম পদক্ষেপ সাফল্যের সঙ্গে রাখতে সাহায্য করে। আমরা খুঁজতে বসি, নতুন কে, নতুন জায়গা, যেখানে কেউ যায়নি, নতুন বিষ্ময়, যাকে কেউ জানেনি, তাকে জানতে চাই, আনতে চাই চেনার জগৎে। নতুন প্রাণী, নতুন উদ্ভিদ, নতুন রোগ, নতুন জিন..সমস্ত নতুনকে চেনার সারিতে এনে আমরা ফেলি স্বস্তির নিশ্বাস।

আমাদের চারপাশের পার্থিব জগৎ যখন এই নিয়মে চলে, তখন আমরা নিজেরাও এর ব্যতিক্রমী হইনা। অচেনা মানুষটিকে চেনা করে নিতে, সবার প্রথমে চলে পরিচয়। শিশুর সঙ্গে এই অবাক পৃথিবীর পরিচয় হয় সব থেকে কাছের ওই দুজন মানুষের হাত ধরে। শুধু ওই মানুষ দুজনের সাথেই বোধহয় আলাদা করে কোনো পরিচয় এর প্রয়োজন পড়েনা, বাকি আর সবার সাথেই বোধয় দরকার হয় আনুষ্ঠানিক পরিচয় এর। সেই ছোট্ট শিশু বড় হয়, আপন বৃত্ত, আপন গন্ডী ছাড়িয়ে পা বাড়ায় আরো বড় জগতে। বৃত্ত বৃহত্তর হতে থাকে। প্রতিনিয়ত কত নতুন মুখ, নতুন ভিড়। নতুন অভিজ্ঞতা। নতুন পরিচয় এর সারি। কখনো সে পরিচয় শুধুই চলার পথের ক্ষণিকের সাক্ষী হয়ে থেকে যায়, আবার কখনো তা পরিচিত করে নেয় তার খুব কাছের কারোর সাথে। আর যতবার সেই পরিচয় এর কথা আসে, জানিনা কেন, শুধু মনে পরে যায়, শিলং পাহাড়ের ওপর, চলতি পথের বাঁকে কবির কল্পনায় গড়ে ওঠা সেই এক পরিচয় এর কথা, যাকে কল্পনা বলতে মন চায়না। যুগ যুগ ধরে, আমরা সবাই যেন কোথাও না কোথাও উন্মুখ হয়ে থাকি ওইভাবে পরিচিত হতে। স্বপ্ন যেখানে বাস্তবের রুক্ষতায় আহত না হয়ে ওই শিলং পাহাড়ের মেঘের মতোই হালকা নরম পেঁজা তুলোর মতো স্থির থাকে। যে "মেঘ হাত দিয়ে যেন ছোঁয়া যায়". আর সেই পরিচয় পর্বের মতোই কত সময় আমরা পরিচিত করে নি, একে, অন্যকে, ভালোবেসে নিজের নামে নিজের মতো করে নতুন নামকরণে কাছের করে নি। ভাগ করে নি মুহূর্ত। তৈরি হয় অসংখ্য মুহূর্তরা। তারপর হয়তো, একদিন পথ আলাদা করে দেয়, থেকে যায় ওই নাম, সন্তর্পনে সংগোপনে মনের মনিকোঠায় অসংখ্য মুহূর্তদের সাথে। কখনো সযতনে , কখনো বা অযতনে , অনাদরে। কিন্তু থেকে যায়।

আর এই নামকরণের সাথে সাথেই অঙ্গাঙ্গি ভাবে এসে যায়, সম্পর্ক। চেনা গন্ডির, চেনা সম্পর্কের বাইরে অন্য আর কিছু সম্পর্ক এর কথা ভাবলেই, মনের মধ্যে শুরু হয় ভীষণ এক অস্বস্তি। ভাই, বোন, মা, বাবা, স্বামী,  স্ত্রী, সন্তান এর মধ্যে ছোঁয়া আছে এক নিশ্চিন্তততার। চেনা গন্ডি, চেনা নাম। চেনা সম্পর্ক। কিন্তু এর বাইরেও আমাদের নিজেদের বৃত্ত হতে থাকে বড় , পরিচিত হতে থাকি কত কারোর সাথে, কেউ কেউ তাদের মধ্যে, আমরা চাই বা না চাই, এসে পরে আমাদের একান্ত নিজের সেই ছোট্ট বৃত্তের ভেতরে, যে বৃত্তে আমরা সহজে কাউকে ঢুকতে দিনা, কিন্তু যে বৃত্তের মধ্যে একবার ঢুকে গেলে, তাকে সমস্ত স্বত্বা দিয়ে আগলে রাখতে চাই। সেইরকম কিছু মানুষ হটাৎ কখনো কখনো অযাচিত হয়তো অবাঞ্চিত ভাবে আমাদের জীবনে পৌঁছে যায় আর তারপর ভীষণ ভাবে সত্যি হয়ে ওঠে তার উপস্থিতি। বাঞ্চিত হয়ে ওঠে তার প্রতিদিনের রোজনামচা। হটাৎ ই কিছুদিন আগে যে ছিল সম্পূর্ণ অচেনা, তার ভালো থাকা খারাপ থাকার সাথে নিজেদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও যেন কখন কিভাবে জড়িয়ে যায়। মনেই হয়না এই পরিচিতি খুব অল্প দিনের জন্যে। মনে হয় যেন যুগ যুগান্তর ধরে এই পরিচিতি। সামনের গাছটায় নতুন পাতা এলেও যাকে বলার জন্যে মন ছটপট করে। যাকে নির্দ্বিদ্ধিধায় করা যায় নিম ফুল ভাজা দিয়ে আলুভাতে খাবার নিমন্ত্রণ। দুপুর বেলায় শুয়ে শুয়ে আচার খাবার ইচ্ছেপ্রকাশ। অথবা ওই চোদ্দটা তিথির খণ্ডতা পূরণের অপেক্ষা , করা যায় একসাথে। একসঙ্গে চাঁদ কে যায় খোঁজা অথবা ভোর হবার প্রথম খবর টা পৌঁছে দিতে ইচ্ছে করে সবার আগে। ভোর তো হবেই। সব জায়গাতে ই দিনের নিয়মে, সময়ের নিয়মে রাত পার হয়ে ভোর হবে, তারপর আবার শুরু হবে রাত্রির স্তব্ধতা। তুমি সেই ভোর হবার খবর পৌঁছে দিলেও হবে, না দিলেও হবে। তবু তোমার মনে হবে, আমি ই দি। নতুন দিনের নতুন বার্তা আমি ই পৌঁছে দিয়ে আসি। কিন্তু কেন , কেন মনে হবে তোমার এ রকম। ও তোমার কে, যে তার জন্যে তোমার এই সহজাত ভাবনা। এ প্রশ্ন ও কখনো কখনো আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে বই কি। নিজের মনের ভেতরে নিজেই জিজ্ঞাসা করতে থাকি, ও কে আমার। কেন জানো, কেন ওই প্রশ্ন জানো? ওই যে, নতুন।...নতুন, নামহীন গোত্রহীন অচেনা সম্পর্ক আমাদের মনে তৈরি করে তাকে গোত্রভুক্ত করার বাসনা। বিপরীত লিঙ্গ হলে সমস্যার খুব সহজ সমাধান তোমাকে আশেপাশের মানুষ জন ই দিয়ে দেবে। প্রেম। 😊আর সমলিঙ্গ তে ব্যাপারটা আরো একটু ভাবনার। ব্যাপারটা কি, নিজের কেউ নয়, তবু এত। ....কি এত ? প্রেম। 😊

আমি ভাবি প্রেম তো বটেই।  বিশ্ব জুড়ে তো শুধু প্রেমের ই ফাঁদ। অবশ্যই প্রেম। সম , অসম , ক্লিব এ যে লিঙ্গ ই হোকনা কেন।  এ আমার প্রেম। আমার ভালোবাসা। আমি যেমন চাঁদ দেখতে ভালোবাসি, যেমন ফুল ভালোবাসি, যেমন নতুন কচি সবুজ পাতা দেখলে ভালোলাগায় আমার কান্না পেয়ে যায়, যেমন ওই যখন চাঁদের আলোয় নারকেল গাছের পাতা গুলো ভিজে যায় মনে হয়, তখন যেমন ভালোবাসায় আমি পাগল হয়ে যাই। দেখে দেখে আশ মেটেনা। যেমন ওই যখন সন্ধ্যে আরতি হয়, মনে হয় যেন আর ওই আরতির শব্দ যেন কখনো না থামে। বুকের ভেতরের ওই উথাল পাথাল কখন স্তব্ধ কান্না হয়ে ভালোলাগায় ফেরত পাই। ঠিক তেমন ভাবেই কিছু কিছু সম্পর্ক আমাদের নিজেদের অজান্তে ভীষণ কাছের একবারে মনের মাঝখান টাতে যেন বসে আছে। জানতেই পারিনি, বুঝতেই পারিনি। কখন কিভাবে।
কোনো ভালো বই পড়লে বলতে ইচ্ছে হয়, কোনো ভালো জায়গায় গেলে সঙ্গে নিতে ইচ্ছে হয়, কোনো ভালো খাবার খেলে মনকেমন করে। জ্বর হলে মনে হয়, এখুনি ছুটে যাই। মনখারাপ হলে মনে হয় পাশে বসে ভাগ করে নি। আর এই সব ইচ্ছে সবসময় এক জনকে ঘিরে যদি না হয়, হয়তো তখন আমাদের নিজেদের মনেই প্রশ্ন ওঠে, সম্পর্কের, পরিচয় এর নাম এর। আমরা হাঁতড়াই , হাঁতড়াতে থাকি। ভাবতে থাকি। কি মানে এর। জানিনা। এ পৃথিবীর অপার বিষ্ময় এর মতো এও হয়তো এক বিষ্ময়। অনেক কেনোর মতো এও হয়তো অজানা। তবে, সেদিন একটা খুব সুন্দর গান শুনলাম। নতুন একটা গান। দুই বন্ধুর। যে বয়সে মানুষ লিঙ্গ বিচার না করে, শুধুই মনের টানে ভালোবাসে, আর সেই নিষ্পাপ নিষ্কলুষ ফুলের মতো গড়ে ওঠা সম্পর্ক আস্তে আস্তে তার মিষ্টি সুগন্ধে চারিদিক আমোদিত করতে থাকে। যে বয়সে সম্পর্কের মধ্যে কেন আর কি পাবোর হাজার টানা পোড়েন সম্পর্কের সমস্ত মিষ্টতা নিঙড়ে নিয়ে তার বৈধতা বিচারে বসেনা। যে বয়সে তুই ঠিক আমার দিদির মতো বা তুই ঠিক আমার বোনের মতো বা তুমি ঠিক আমার চেনা অমুক দাদার মতো অথবা তোমার মধ্যে আমি নিজের ভাই কে পেলাম, এসব বলে সম্পর্কের নামকরণের কোনো দরকার হয়ে পড়েনা। যে বয়সে ভালোবাসি বলতে কোনো দ্বিধা হয়না। মনকেমন এর কথা চিৎকার করে বলতে পারা যায়। সেই বয়সের এক মনের টানের গান। অনেকবার শুনলাম গানটা। আর সাথে সাথে ওই যে না পাওয়া সম্পর্কের নাম? তাও খুঁজে পেলাম। সখ্যতা। দিদি বোন নয়। প্রেমিক প্রেমিকা নয়। শুধুই বন্ধুত্ব। নিবিড় ভাবে জড়িয়ে রাখার। আগলে রাখার। কোনো কিছু দিয়ে নয়, কোনো কিছু নিয়ে নয়। কোনো কিছুর আশায় নয়। কোনো কিছুর বিনিময়ে নয়। কোনো কিছুর দাবিতে নয়। শুধুই বন্ধুত্ব। সখ্যতা। আর গানটা হলো ,

তুই যেভাবে হোক, আয় চলে ফিরে তাকাস
তুই মেঘলা মন , যায় গলে ভেজা আকাশ
তুই যেখানে হোক, দৌড়ে আয়
যদি পারিস
তুই, একা একা , ভেজা দুগাল
মিঠে বারিশ
আমারও খুব বলতে ইচ্ছে করছে। এইভাবেই। সমস্ত দ্বিধা, ভেদাভেদ, প্রশ্ন, উত্তর , ঠিক বোঝা, ভুল বোঝার হাজার জটিলতা সরিয়ে দিয়ে, হটাৎ আজ ছাদে, চাঁদের নরম আলোতে মাদুর বিছিয়ে, পা ছড়িয়ে বসে আমতেল আর চানাচুর দিয়ে মুড়ি মাখা খেতে খেতে অনেক গল্প করতে ইচ্ছে করছে। সত্যি সত্যি হাত ধরতে পারলে সকল দূরত্ব তুচ্ছ হয়ে যায় বৈকি।

আজ আকাশে চাঁদ নেই। একটা তারাও নেই। তার বদলে আকাশে আজ মেঘ এর ঘনঘটা। অল্প অল্প মেঘ ডাকছে আর কেমন একটা ঝোড়ো হাওয়া চলছে। আমার একলা ঘরে ধূপের ধোঁয়াতে আমার মনের গভীর থেকে উঠে আসা সুর টাকে ঠিক মতো করে যেন চিনতে পারছিনা আজ। চেনার চেষ্টা করছি। আর ভাবছি, জানিনা ওই যে, সবার ওপরে থেকে যিনি মুচকি মুচকি হেসে চলেছেন, তাঁর মনে কি আছে। তবে এটা জানি, যার জন্যে যেটা সবথেকে ভালো আর যেমন করে ভালো, ওই ঠাকুর সেসব কিছুকে ঠিক তেমন করেই সাজাচ্ছেন। আমাদের শুধু থেমে গেলে চলবেনা। প্রত্যেকটা দিন কে নিজের বেস্ট টুকু দিয়ে আমাদের  সাজিয়ে তুলতেই হবে। তবে সর্বাঙ্গ সুন্দর হবে সবকিছু। শুধু এই ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যে সেই  প্রার্থনাই রাখলাম। সেই শক্তি আমায় দিও ঠাকুর। সেই শক্তি সবাইকে দিও।


Thursday, 14 June 2018

আমার অনেক কাজের মাঝে ,
এই মেঘলা দিনের মনখারাপ
শুধু সূর্য্য কেন খোঁজে
আবছায়া এই অস্পষ্টতা স্পষ্ট হয়ে যাক
যা আছে সব যেমন কিছু, থাক পরে থাক, থাক।
কাজের ফাঁকে অকাজের এই নিত্য আনাগোনা
আমার ভাল্লাগেনা।
আমার ঘষা কাঁচের জানলা দিয়ে
মুষড়ে পড়া চাঁপা
সকল কাজের মাঝে
সব সময় যেন মাপা ।
চাঁপা কেন মুষড়ে আছে
জাগছেনাতো জেগে,
কিছু মিথ্যে আবেগে-
আমি লিখছি যেন লেখার নেশায় -
চলছি চলার স্রোতে,
আমি খুঁজছি শুধু আলোর দিশা,
স্বপ্ন জেগে জেগে,
কিছু মিথ্যে আবেগে।
সত্যি হোক, স্বপ্ন হোক
কি এসে যায় তাতে ,
নাহয় স্বপ্ন দিয়েই সত্যি সাজাই ,
চলি স্বপ্নের ই পথে।
সুন্দর সেতো আপনি হবে।
ওই পথের ই আবেগে।।



Friday, 1 June 2018

কল্পনা

সকাল বেলাতে চেনা শব্দ খুঁজে পেতে কষ্ট হচ্ছিলো। পাচ্ছিলামনা। এখন আবার অনেক শব্দ যেন ভিড় করে আসছে। কি যে করি এই মন টাকে নিয়ে, আজ কের কোকিল ডাকা নরম ভোর এ সবুজ, ভেজা ঘাসে খালি পায়ে হাঁটাটাই কি তাহলে যত নষ্টের গোড়া। না, তাতো নয়, তাহলে আমার আনন্দ ভেজা মনটা বোধয় মেঘলা আকাশে বৃষ্টি খুঁজতে গিয়ে, খুঁজে পেলো আদোরে মোরা ছেলেবেলা। যার প্রতি পরতে পরতে আছে বাবার হাত ধরে পথ চলা। খুব ইচ্ছে করছিলো নতুন চকচকে কভার এর টিনটিন এর গন্ধ শুঁকতে। অথবা এস্টেরিক্স ওবেলিক্স এর মজার যুদ্ধ এর কাহিনীর মধ্যে বুঁদ হয়ে যেতে। আর সব থেকে বেশি করে ইচ্ছে করছিলো আমার প্রতিদিনের প্রতিমুহূর্তের তৈরি হওয়া ওই রাশি রাশি কথার সাক্ষী করতে ওই মানুষটাকে, যার হাত ধরে আমি রোজ বিকেলবেলা যেতাম পাশের মাঠে যে গরু গুলো চড়তো তাদের কচি বাঁশ পাতা খাওয়াতে, ছাগল ছানার গলায় আদর করতে বা নদী তে পাতা ভাসাতে। মনে পড়ছিলো আমাদের বাড়ির সামনের সেই ছোট্ট কালভার্ট টা, যার একদিকে পাতা ফেলে দৌড়ে উল্টোদিকে গিয়ে দেখতাম কতক্ষনে সেই পাতাটা ভেসে আসছে। পরে, বড় হয়ে যখন সময়ের অঙ্ক শিখছিলাম, তখন বাবা কতবার সেই ঘটনা মনে করিয়ে দিছিলো অঙ্ক শেখানোর সময় আর আমি প্রতিবার ই বলতাম, এখন ও চলো না যাই, আর বাবা বলতো, তোমার এখন কতো বন্ধু, বাবার সাথে আর তুমি পাতা ভাসাতে যাবে নাকি। ছদ্ম রাগ দেখাতাম বাবার ওপরে। 

আজ এখানে যখন সেই সব দিন থেকে অনেক দূরে, এই পাহাড়ে ঘেরা ছোট্ট জায়গাটাতে বসে বসে বড় ইচ্ছে করছিলো, বাবা বলে ডাকতে। কতদিন ডাকিনি তো, তাই। 

কাজ ছিল আজ সকাল থেকেই, কিন্তু কাজের ফাঁকে গ্যাপ ছিল অনেকটা করে। যে সময় এর ফাঁক গুলোতে না অন্য কোনো কাজে করা যাচ্ছিলো মনোসংযোগ, না যাচ্ছিলো, চুপ করে বসে থাকা। মেঘলা আকাশ আমার চেনা সকালটাকে বারবার হারিয়ে দিচ্ছিলো আমার কাছ থেকে। সূর্য্য ওঠা শান্ত সবুজ, নরম ভিজে ভিজে ভোরটাকে বেলা বাড়ার সাথে সাথে মেঘলা আকাশের মনখারাপ করে নিলো অধিকার। আমার চেনা শব্দভাণ্ডারে পড়লো টান। কিন্তু প্রকাশের অস্থিরতায় হাতে থাকা মোবাইল এর ব্লগ খুলে, বিদেশী ভাষাকেই করলাম স্মরণ। তারপর বৃষ্টির খোঁজ আবার আমার মন আকাশে তুললো জল এর তৃষ্ণা। আর পাগল এ মন এই চারদেয়ালের হাজার হিসেব নিকেষ তুচ্ছ করে, linux এর সমস্ত কোড কে অগ্রাহ্য করে, ছুঁতে চাইলো বৃষ্টির জল। 'দারুন অবাধ্যতায়' পারি দিলো স্বপ্ন মাখা বারান্দাটায়, যার নিচ দিয়ে কুলকুল করে নদী যদি নাও বয়ে যায়, চারপাশটা কিন্তু সবুজে মোরা থাকতেই হবে। সামনের কাঠের গেট টাকেও কিন্তু সাজতেই হবে গাঢ় নীল অপরাজিতা আর গোলাপী লালের মাধবীলতায়। তারপর বৃষ্টি নামবে। যে বৃষ্টি বহুদিন, বহুদিন দেখিনি, সেই অঝোরধারায় বৃষ্টি, কালো মেঘের বুক চিরে তড়িতের হাতছানি, আমার দুপুর বেলাকে ভরিয়ে দেবে কানায় কানায়। মেঘের গর্জন আমার ভয় করে। কিন্তু সেদিন নাহয় কোনো নিশ্চিন্তের আশ্রয় সেই ভয় কে ভালোলাগায় করে দিক রূপান্তরিত। আর দুচোখ ভোরে আবেগ তাড়িত স্বপ্নে কানে বাজুক শুধু বৃষ্টির শব্দ। অথবা বৃষ্টিকে সামনে রেখে  আয়েশি easy চেয়ার এর হাতলে রাখা থাক এক কাপ কফি, আর হাতে থাকুক সুনীল গাঙ্গুলির 'সেই সময়' বা  নারায়ণ সান্যালের 'রূপমঞ্জরী' বা বঙ্কিমের গড় মান্দারনের মুগ্ধতা, বাতাসে ভাসুক নাহয় প্রিয় গজলের কোনো সুর অথবা সেই চেনা 'ঝরঝর মুখর বাদল দিনে ' কিংবা শব্দ যদি খুব ই বাহুল্য হয়ে যায়, তখন নাহয় একটা শুধু কোনো বাঁশির সুর বা সেতারের ঝংকার মিশে যাক বৃষ্টির শব্দের সাথে। আর নাম না জানা কোনো ফুলের গন্ধ বাতাসকে করে তুলবে আনমনা। আর তখন এ পৃথিবীর সমস্ত কালো, সব অন্ধকার ঘুচিয়ে দিয়ে, সব মালিন্য দূর করে দিয়ে শুধু অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়বে। আর তারপর যখন বৃষ্টি শেষে কনে দেখা আলো তে চারিদিক ঝলমল করবে, তখন বৃষ্টিস্নাত এই পৃথিবী পরম ভালোবাসায়, আপন মাধুরীতে,  আপনার স্মিত শান্ত মুখখানি তুলে ধরবে। 

আজ এখানে বৃষ্টি নেই, গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহ জানান দিয়ে গেল এ সব ই আমার শুধুই মনের কল্পনা। তা হোক, সত্যি আর স্বপ্ন মিলে মিশে যদি এক হয়ে যদি সহাবস্থান না করে, তবে যে আমাদের এই জীবনটা নিতান্তই শুষ্ক হিসেবের খাতা হয়ে যাবে। অনেক হিসেবের মধ্যে নাহয় রইলো আঁকা আমার  আজকের দুপুরের এই বেহিসেবি বৃষ্টি ধরার ইচ্ছে, যা আমার ছেলেবেলার পথ কে ভিজিয়ে দিয়ে, আমার বড়বেলার আমিকে আবার ফিরিয়ে দিয়ে গেল বাস্তবের মাটিতে। এতে লাভ লোকসানের কি যে কতটা কি হলো জানিনা , তবে বহুদিনের না পাওয়া চেনা সোঁদা গন্ধ এই একরাশ চাঁপার সাথে মিশেও বা গেল হয়তো। 

you are always there light to show

sometimes I miss you
miss you so much, so very much 'baba'
its been a long time, long time we didn't walk togethr
or watch the movie full of adventure
nobody could ever give all the answers I asked for
with u, I ahev also lost all the story fair
tintin never comes with Johnson Rohnson
there s nobody to talk on agatha crishti or jule verne or robinson
I miss you on my every achievement or failure
On my daily routine science or all the small or big things, I endure
i know you are always there
but miss u always to see every father daughter
God bless them with long happy life
I wish I could get more and more time to spent with
anyways, i know u never like to see that teary unhappy face
Promised you to live my life with full of joy and grace
This is the starting of the day, long way to go
I know you are always there light to show
Path to follow

Wednesday, 30 May 2018

এক ই চাঁদ

হাওয়া যখন মাতাল হোলো,
উছলে পড়লো আলো।
তুমি বললে কেমন আছিস,
আমি বললাম ভালো।

একটাই চাঁদ মাথার ওপরে,
শিরশিরানি হাওয়া।
কেমন করে যায় মিলে ,
এক ই চাওয়া পাওয়া।
অনেক কিছু চাইনা , শুধু
একটু খানি আলো
না পেলেও ক্ষতি নেই কিছু
শুধু থেকো তোমরা ভালো।
চাঁদের আলোয় যাচ্ছে ভেসে
দিগন্ত, চরাচর।
হিসেবের খাতা চলো বন্ধ করি
কিছু নেই দরকার।
চাওয়া, পাওয়া, পাওয়া, না-পাওয়া
থাক পরে থাক ওই কোণে।
আমরা নাহয় পাড়ি ই দিলাম
ওই জোছনা ভেজা 'বনে ' .
চাঁপার গন্ধে পথ চিনে নি,
বেলি দোলাক মাথা।
দখিনা হাওয়া আজ পাগলপারা ,
একই আকুলতা।
তোমার টবের গোলাপ যখন
তাকালো মুচকি হেসে ,
চাঁদের আদর জড়ালো গায়ে
বড্ডো ভালোবেসে ,
ঠিক তখন ই চাঁদকে আগলে রেখে বুকে
বললো শুকতারা।
আছি আমি, রইলাম ও,
চলতে থাকিস, কেউ হবিনা পথহারা।

এক ই চাঁদ, এক ই তারা
একটাই ওই আকাশ
দূরে হোক, কাছে হোক
সেই এক ই মধুর আভাষ।






Wednesday, 23 May 2018

সন্ন্যাসী

 ছাদে ছিলাম। কতক্ষন ঠিক জানিনা। ঘড়ি, মোবাইল, facebook , সোশ্যাল মিডিয়ার হাজার রকমের বিভ্রান্তিতে আমরা নিজেরা নিজেদের সাথে সময় কাটাতে ভুলেই যাই কখনো কখনো। মাঝেমাঝে তাই নিজেকে কিছুক্ষনের জন্যে এই সব কিছু থেকে বের করে নিয়ে আসা দরকার হয়ে পরে। তাই কিছুক্ষনের জন্যে নিজেকে এই সব কিছু থেকে দূরে নিয়ে গিয়ে আমার ওই একান্ত আপনার সময়টা একান্ত ভাবে শুধু নিজেকে দিয়েছিলাম। সমস্ত আকাশ আবীর রঙে রাঙিয়ে আমার দিনের দিবাকর বিদায় নিলেন। ওই দূরে পাহাড়টার ওপারে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম। তারপর দেখলাম। আর নেই। পরে আছে লালে লাল আকাশ। 

গত কালের অস্থিরতা, আজকের কি এক অপেক্ষার সাথে মিশে আমার মনকে করে তুলেছিল অশান্ত। ওই স্থির, ধ্যানমগ্ন প্রকৃতি, আসতে আসতে লাল রঙের রেশ মুছে গিয়ে যখন সন্ধ্যার গভীরতা কে তুলে ধরতে লাগলো, দূরে ওই পাহাড়ের চূড়ার ওপরএর মন্দির থেকে ভেসে আসা ওই ক্ষীণ কিন্তু গভীর শান্তিময় সন্ধ্যারতির শব্দ ভেসে এলো। তখন বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক ঢেউ উঠলো। যেন দামামা বেজে উঠলো। তারপর ধীরে ধীরে সেই শব্দ সমস্ত কোলাহল স্তব্ধ করে দিয়ে, অনন্ত সুন্দরের মতো আপনার মুখখানি তুলে ধরলো। আকাশে তখন এক মঙ্গলময় চাঁদ স্মিত হেসে তাকাচ্ছে। মনে হলো আমার সমস্ত দিনের জমে থাকা অজস্র প্রশ্ন, গ্লানি, ব্যাথা, বেদনা, অপূর্ণতা সব কিছু থেকে আমি যেন বেরিয়ে আসতে পারলাম , সদ্য স্নান করার পর যেমন শীতল, সুন্দর বোধ হয়, সেইরকম মনে হলো যেন ওই সন্ধ্যা নামার মুহূর্তে ওই অস্তগামীর আভায়, চাঁদের স্মিত হাসিতে অবগাহন করে উঠলাম। 

বুকের মধ্যে যখন সেই গভীর প্রাপ্তি নিয়ে নিচে এলাম, তখন হটাৎ আবার প্রতিধ্বনি শুনতে পেলাম। শান্তি, সেই পরম প্রাপ্তির প্রতিধ্বনি। জানিনা কেন নিজের সমস্ত চেতনা এইভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এ কিসের আহ্বান। এ কিসের ইঙ্গিত। এ কি পরীক্ষা।  তবে যাইহোক, বড় পবিত্র এই প্রতিধ্বনি। আর সেখান থেকেই আরো এক বাসনার কথা ভেসে এলো, 'ভাবছি সন্ন্যাস নেবো'। ঠিক এইরকম ই কিছু তখন অনেক বছর আগে, আমি যখন কলেজ এ পড়ি মনে হয়েছিল। সবসময় মনে হতো, এ জীবনের কি মানে, কি লক্ষ্য এই জীবনের। কেন আমরা এসেছি এই পৃথিবীতে, শুধুই কি চাকরির জন্যে পড়াশুনো, টাকা রোজগারের জন্যে চাকরি, ভালো থাকার জন্যে বিয়ে, সংসার, আমার আর আমার, গাড়ি , বাড়ি।..তারপর।...তারপর কি? বাবাকে বলেছিলাম আমি বিয়ে করবোনা। বাবা বললো কেন। আমি বলেছিলাম না যদি না করি, বাবা বলেছিলো না সেটাও করতেই পারিস। কিন্তু না বুঝে শুধু মোহে পরে কিছু ভাববিনা। আমি ঠিক জানতামনা, বলেছিলাম, জানিনা বাবা, তবে মনে হয় আমি যেন সন্ন্যাসি হয়ে যাই। বাবা রামকৃষ্ণকথামৃত পরে আমাকে সন্ন্যাসী হওয়া নিয়ে রামকৃষ্ণ কি বলেছেন জানাতে বলেছিলো। পড়েছিলাম। সব হয়তো বুঝিনি। কিছু বোঝা নিয়ে কিছু না বোঝা নিয়ে সেই থেকে আজ পর্যন্ত মনের মধ্যে থেকে গেছে, যে সংসারে থেকেও সন্ন্যাসী হওয়া যায়। রামকৃষ্ণ এর সেই উপমা নিজেদের যদি হাঁসের মতো তৈরি করতে পারি, হাঁস যেমন শুধু দুধ টুকু খায় জল টুকু ফেলে দিয়ে। সেইরকম। সংসারের মধ্যেও দুধ আর জল মিশে থাকে, সেই জল মিশ্রিত দুধ থেকে আমাদের শুধু দুধ টুকু তুলে নিতে হবে। সেইটাই হলো সাধনা। সেই হলো আসল সন্ন্যাস। আমার অপর প্রান্ত থেকে যে সন্ন্যাস হবার কথা ভেসে এলো আজ, তাতে আমার ভীষণ ভাবে এই কথা মনে হলো। আর মনে হলো, তুমি ঠিক সেই পথেই আছো, পদ্ম পাতায় জল এর মতো সংসারের ওপর ভেসে থেকে তার মধ্যে থেকে অথচ তার সাথে ভেসে না গিয়ে স্বমহিমায় সূর্য্যের কিরণে জ্বলজ্বল করছো। তোমার সৃষ্টির নেশা, তোমার ভালোবাসা, স্নেহ তোমার চারপাশে মায়ার বলয় রচনা করে তোমাকে ঘিরে রাখবে। অসাধারন আমার মধ্যে কিছুই নেই, আমি খুব সাধারণ আর খুব সাধারণ ভাবে আমার চারপাশটাকে আমি দেখতে চাই। আমার চাওয়া, পাওয়া আর পাওয়া না পাওয়ার মাঝে এক অলিখিত সেতু বন্ধন আপনি হয়ে গিয়ে আমাকে পৌঁছে দিয়েছে এই চাঁদনী রাতের মাধুরীর খোঁজে। সেই মাধুরী মমতা হয়ে তোমাকে জড়িয়ে থাকুক , তোমার সব অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দিক। কিন্তু তা যেন অন্য কোথাও অসুন্দরের ছায়া না ফেলে। 

এখন রাত হয়েছে। চাঁদএর আলো খুব নরম হয়ে, আদর হয়ে হয়তো জড়িয়ে রাখছে কাউকে। কেউ বা হয়তো সে আলো অবহেলায় সরিয়ে দিচ্ছে দূরে। হয়তো কেউ খুঁজছে আবার হয়তো কেউ পেয়েও হারাচ্ছে। কি বিচিত্র এই সংসার। আমাদের এই সংসারে প্রতিনিয়ত ঘটে চলে নানান ঘটনা। কত তার অর্থ, কত তার ইঙ্গিত। হয়তো কত ভিন্ন ভিন্ন ভাবে তা আমাদেরকে প্রতিদিন একটু একটু করে আমাদের চলার পথের পাথেয় খুঁজে দেয়। আমাদের বোধ কে উন্নত করে। চলার পথে, কত ইচ্ছে, কত আশা অনেক সময় আমাদের সেই যাত্রাকে মেদুর করে তোলে। হয়তো পথের বাঁকে পৌঁছে আমরা চুপ করে ভাবতে থাকি, ফেলে আসা পথের কথা। হয়তো ভাবতে থাকি, আগামীর পথের কথা। তারপর আবার চলতে শুরু করি। পথ নিজেই পৌঁছে নিয়ে যায় আমাদের গন্তব্যে। সেই পথে, আমাদের শুভ কামনা, শুভ চেতনা আর অভিজ্ঞতা আমাদের পরিণত ভাবে ভাবতে শেখায়। তখন আমরা আমাদের না পূরণ হওয়া ইচ্ছে গুলোকে, পূরণ করার জন্যে না দৌড়ে, স্বপ্ন দিয়ে মুড়ে ভবিষ্যতের হাতে গচ্ছিত রেখে দি। আর মনে মনে ভাবি, কোনো একদিন যদি ভগবান আজকের এই পরীক্ষাতে পাশ করার জন্যে আমাদের পুরষ্কৃত করে আমাদের হাতে তুলে দেয় ওই ইচ্ছাপূরণের চাবিকাঠি। তখন সবাইকে ভালো রেখে, নিজেদের জন্যে রাখবো একটা দিন যেখানে আজকের যা কিছু তখন খুব যত্ন নিয়ে ভালোবেসে আলোচনা করবো। ঠোঁটের ওপরে হাসির রেখা হয়তো চাঁদ কে বাধ্য করবে কোপাই এর ওপর নিজের ছোয়া ফেলতে। আর সেদিন একরাশ চাঁপা ফুল তুলে রেখো আমার জন্যে। আমরা সেদিন নাহয় আমাদের ক্রমবর্ধমান ইচ্ছেখাতার ইচ্ছের লিস্ট গুলো নিয়ে বসবো। মনে পড়বে আদুরে অভিমান গুলোর কথা, মনে পড়বে সবুজ এর আনন্দ, নীলের গভীরতা, সাদার শুভ্রতার কথা। আর এখন সেই দূর ভবিষ্যতের সুখকর দিনের কথা মনের মাঝে রেখে এসো মনে করি ওই সন্ধ্যারাতির শব্দকে।  আর ওই সন্ধ্যারাতির শব্দ, ধূপের গন্ধ , ধুনোর আবেশের সাথে মিশে যখন স্থির, অচঞ্চল শান্তি নিয়ে আসবে। তখন ওই কর্পূর জলে হাত ডুবিয়ে, সেই শান্ত, শীতল জল এ ভেজা ঠান্ডা হাতে , অনুভব করবো আজকের সুন্দরতা কে, আগামীর সুন্দরতাকে, চিরকালীন সত্যি, চিরকালীন সুন্দরতা কে । আর সেই শীতল সুন্দরের অনুভব ছড়িয়ে পড়বে তোমার মধ্যে, আমার মধ্যে, আমাদের উত্তপ্ত, অশান্ত পৃথিবীকে শান্তকরে আগামীর আহ্বান শোনাবে। 

Friday, 18 May 2018

বিষয়ী

 সন্ধ্যে বেলায় বাড়ির উষ্ণতাটা ভীষণ মিস করি। ধুপ ধুনো কর্পূরের গন্ধ, তুলসী তলা, আমার সেই ছোট্ট প্রদীপটা, একসাথে চা খাওয়া, সারাদিনের সমস্ত রকম গল্প। কত আনন্দ কে যে যত্ন করে ধরে রাখা যেতে পারে, ওই ৪ দেওয়ালের মাঝে। 
আমার নিজের গৃহকোণটাকেও হয়তো চেষ্টা করি, ঐরকম ঝকঝকে, জমজমাট করে তুলতে, ঘষামাজা চলছে, একদিন নিশ্চই, mobile, netflix এর নানান সাসপেন্স, মার্ডার আর কমেডি শো থেকে বার হয়ে এসে আমার ছোট্ট ঘর এর সন্ধ্যাও সোনালি হয়ে গল্প গানে সেজে উঠবে। নিশ্চই হবে তা। অপেক্ষা করবো। তবে আজকে জানিনা কেন এই ঝোড়ো ভিজে হাওয়ার সন্ধ্যে বেলায় একলা আমার এই হোস্টেল এর ঘরটাতে বসে, ধূপের ধোয়াতে, ঝরে যাওয়া চাঁপা ফুলের গন্ধে খুব কান্না পাচ্ছে। বুঝলাম এসব ই ওই বদমাশ মনখারাপ টার কারসাজি। আবার আমার মধ্যে ঢুকে আমাকে তছনছ করে দেবার ইচ্ছে বুঝি। না কিছুতেই একে জিততে দিলে চলবেনা। কিছুক্ষন চালালাম যুদ্ধ। তারপর যেন আর যুদ্ধেরও ইচ্ছে হলোনা। কেমন এক বিষন্ন ক্লান্তিতে চুপ করে বসে রইলাম। মনে হলো জীবনে আমার বোধয় আর বিষয়ী হওয়া হলোনা। কতবার ভেবেছি হোস্টেল এর এই রুম টা ছেড়ে দেব। কতগুলো করে টাকা HRA তেই কেটে যায়, একটু নাহয় কষ্ট করে যাতায়াত করে নেবো। কিন্তু কাজটাও এমন আর আমার "বন্ধু'বরে"র কথায় আমার এই আলটুসি health টাও এমন যে কিছুতেই ওই যাতায়াত করা হয়ে ওঠেনা। শুধু যদি ১০টা ৫টার কাজ হতো, তাহলেও হয়তো কোনো কথা না শুনে জোর করে যাতায়াত ই করতাম, কিন্তু ওই যে স্বইচ্ছেতেই যে মাথার কাজ বেছেছি। তাই মাঝখান থেকে আমি এই  শহর ও শহরতলী র প্রায় দু খানা সংসার সামলাছি গত ৪ বছর ধরে, না আপসোস নয়, উপভোগ ই করি, তাইতো জোর করে নিজে হাতে রান্না করবো বলে রান্নার জন্যে কাউকে রাখতে দিইনি। তাইতো ক্লান্ত হয়ে ফেরার সময় ও বাজার করে নিয়ে যাই, কি কি রান্না করবো ভেবে ভেবে। HRA এর টাকাটা জমিয়ে রাখলে হয়তো অনেক কিছু করা যেত। নাহলে অন্তত পোস্টডক আর বিবাহিতের সুবিধে টা নিয়ে কোয়ার্টার টা তো নেওয়াই যেত। কিন্তু ওই যে বোকামি ই হয়তো। দুটোর কোনোটাই করা হয়নি। তার জন্যে কি আজ আপসোস হচ্ছে, না ঠিক আপসোস নয়, কিন্তু ভাবছি অনেক কিছুই জীবনে হয়তো করা যেত, কিন্তু হয়নি। তবে এটাও আমি মানি, আমি জানিও অনেক বছর পরে যখন একবার পিছন ফিরে তাকাবো তখন বুঝতে পারবো যে যা কিছু না হয়ে যা কিছু হয়েছে জীবনে বা যা কিছু না পেয়ে যা কিছু পেয়েছি জীবনে, ঐটাই হয়তো ওই সময়ের জন্যে আমাদের জন্যে একদম সঠিক। যদি জীবনে আমি যেমন যেমন যা যা চেয়েছি সব ই পেয়ে যেতাম, তাহলে হয়তো কখনো এইভাবে নিজের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পেতে পারতামনা। আমার এই ঘরে সন্ধ্যে এমন মদির হয়ে নেমে আসতোনা। বা ভোর ৪তে থেকে পাখির কাকলি আমাকে ডেকে তুলতোনা। আমার এই হোস্টেল জীবন আমাকে ভীষণ ভাবে নিজেকে চিনিয়েছে। চারপাশটাকে বুঝিয়েছে। হোস্টেল লাইফ আমি আগেও কাটিয়েছি। কিন্তু এই জীবনটা একদম অন্যভাবে আমার কাছে এসেছে। হয়তো এক পরিণত জীবন যাত্রা, যেটা কখনো ভাবিনি, সেটা এখানে এসে দেখেছি তাই। হয়তো এখানে এসে নিজেকে পরিচিত করেছি এক অদ্ভুত বাঁধাহীন বাঁধনএর সাথে, যে বাঁধন অন্য আর কারোর কাছে নয়, যার লাগাম নিজের ই কাছে থাকে। 

আজকের বিকেলের এই ঝড় জল আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিলো গত পরশুর সেই অভিজ্ঞতার কথা। যখন ওই রাতের বেলা ঘরে না ফিরতে পেরে এক মেয়ে একা ল্যাব এ এক কাপ কফি নিয়ে সাক্ষী হলো ঝড়ের মধ্যে দিয়ে আসতে আসতে  কিভাবে অন্ধকার সরে গিয়ে শান্ত দিনের শুরু হয়। সেই মেয়ে যে এতটুকু জোড়ে হাওয়া চললেই জানলা দরজা বন্ধ করে বাবার কোলে গিয়ে আশ্রয় নিতো, সেই মেয়ে। চোখের সামনে সেদিন দেখলো সাধের চাঁপা ফুলের গাছটা ঝড়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে কিভাবে নিস্তেজ হয়ে যেতে লাগলো, সেই শ্বেতশুভ্র ভুল গুলো মাটিতে কাদাতে লুটোপুটি খেতে লাগলো আর ঝড় নিষ্ঠূর ভাবে সমস্ত গাছটাকে যেন তছনছ করে দিয়ে, ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে চলে গেলো। কাঁচের জানলার এপাশ থেকে করার কিচ্ছু ছিলোনা। ভয়ে দলা পাকানো কান্না নিয়ে শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো, পারলোনা তাকে দুহাতে করে কাছে টেনে বুকের মধ্যে আগলে রাখতে। ধুলোর মধ্যে দিয়ে, প্রলয়ের মধ্যে দিয়ে, ঘরে ফিরে এসে দেখলাম, এতো বছরের সাধের ফুলদানি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে মাটিতে লুটোচ্ছে। বুদ্ধমূর্তি একপাশে হেলে, খাতায় আটকে গ্যাছে বলে শুধু কিছু হয়নি। কিন্তু গনেশের গায়ে ঝড় তার চিহ্ণ রেখে গ্যাছে। ধুলো বালিতে ভরা ঘর, ভাঙা ফুলদানি, বাইরে ঝড়ের শো শো শব্দ যেন কেমন এক অশুভ ইঙ্গিতে আমাকে একাকিত্বে ভয়ে, কান্নায় জর্জরিত করে ফেললো। 
ওই ফুলদানিটা প্রথম স্টাইপেন্ড পেয়ে কেনা ছিল। মা এর জন্যে শাড়ি, বাবার জন্যে শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায় এর "ঐতিহাসিক সমগ্র" আর বন্ধুবর টির জন্যে একটা হাফ পাঞ্জাবী কিনে সেই প্রথম নিজের জন্যে কিনেছিলাম যাদবপুরের রাস্তার ধার থেকে ওই ফুলদানীটা। তারপর কলকাতার পাট চুকিয়ে দিল্লিতে আসার সময়ও তাকে সঙ্গে করে আনতে ভুলিনি। যখন যেভাবে যা পেয়েছি, তাই দিয়ে সাজিয়েছি ওই ফুলদানী। কৃষ্ণচূড়ার ডাল, নাম না জানা হলুদ ফুল, চাঁপার গুচ্ছ , বন্য ঘাস পাতা।জ্যোৎস্না রাতে সবকটা পর্দা সরিয়ে দেবার পরে যখন কাঁচের দেওয়াল দিয়ে ঝাঁপিয়ে পরে চাঁদের আলো সমস্ত ঘরটাকে ভাসিয়ে দিয়ে যায়, সকালের প্রথম রোদে যখন ঝলমল করে ওঠে, শীত এর মিঠে রোদ বা গ্রীষ্মের ঝিম মারা দুপুর এ যখন কি এক আবেশ তৈরি হয়, তখন বারবার ওই সব কিছুর সাথে আমার ওই ফুলদানী হেসে উঠে আমার এই ঘরকে বারেবারে সাজিয়ে দিয়েছে। 

সেদিন ওই ভোর রাতে ফুলদানীর ভাঙ্গা টুকরো গুলোকে ফেলে দিয়ে এসে, ঘর পরিষ্কার করতে করতে বারবার যেন কি এক অশুভ আশঙ্কায় মন সংকুচিত হয়ে যাচ্ছিলো। তবে কি এমন কিছু ঘটতে চলেছে আমার নিজের বা আমার পরিচিত কারোর জীবনে, যা থেকে আমি তাকে বাঁচাতে পারবোনা? শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে হবে, ওই ভেঙ্গে যাওয়া? বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো আমার খুব প্রিয়, ওই শ্বেত শুভ্র চাঁপা ফুল গুলোর অসহায় আর্তি। ভয় , গ্লানি , রাত্রি জাগার ক্লান্তি, অজানা আশংকা সব কিছুতে আমি যেন ভীষণ ভাবে শ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম। মনে হচ্ছিলো কোথাও কি পৌঁছে দেওয়া উচিত আমার এই ভাবনার কথা, সাবধান হওয়া উচিত কি অনেক বেশি। জানিনা। সবকিছু পরিষ্কার করে যখন স্নান করে ঘরে এলাম, দেখলাম ঝড় থেমে গেছে। সেই প্রলয় থেকে আসতে আসতে চোখ মেলে তাকাচ্ছে এই ধরিত্রী। চারপাশ ভীষণ রকমের শান্ত, স্থির, ঠান্ডা। সবে স্নান সেরেছিলাম। গা শিরশির করে উঠছিলো। একটা ধুপ জ্বালালাম। আর তারপর ছাদে গেলাম। পশ্চিম আকাশ থেকে তখনো কালো মেঘের ঘনঘটা কাটেনি, আর পুব আকাশ আসতে আসতে , ধীরে ধীরে গোলাপি, তারপর লালে ছোট্ট শিশুর মতো চোখ রগড়াতে রগড়াতে চোখ মেলে তাকাচ্ছে। সেই লাল রং ধীরে ধীরে সমস্ত আকাশকে ভরিয়ে দিতে লাগলো, কিছুক্ষনের মধ্যে কালোর চিহ্ন কোথায় মুছে গিয়ে, প্রলাপের চিহ্ন কোথায় সরে গিয়ে সোনালী আভাতে শুরু হলো নতুন দিন। কিছুক্ষন আগে যে আমি ভয়ে, ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে ছিলাম, কি এক জাদুকাঠিতে সেই আমি ই স্নাত, স্নিগ্ধ হয়ে স্থির হয়ে এই শান্ত আর বড় পবিত্র সেই ব্রহ্মহ মুহূর্তের সাক্ষী হলাম। শুনেছিলাম ব্রহ্মহ মুহূর্তের থেকে পবিত্র ক্ষণ নাকি আর হয়না। র আমি সেই ক্ষনে নিজের মনের এই অল্প কিছুক্ষনের তফাতে এমন পরিবর্তন এমন দুই বিপরীত ধর্মী অনুভবে ভীষণ ভাবে বিস্মিত হলাম। মনে হলো যে ঝড় আসার সে আসেই বোধয় জীবনে, তাকে এড়ানো হয়তো যায়না। কিন্তু সেই ঝড় ও থামে। প্রকৃতি তার আপন নিয়মে সে ঝড় থেকে নিজেকে থিতু করে। আর ঠিক সময়ে ওই নতুন দিনের সূচনা করার মতো সূর্যোদয় তার আপন মহিমায় উজ্জ্বল করে দেয় আমাদের জীবনকে। আবার। বারবার। শুধু আমাদের ওই অনুভব টাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, যাতে ওই যে যখন সূর্যোদয় হবে, তখন ও যেন আমরা ঝড়ে বিধ্যস্ত হয়ে বসে না থাকি, তখন যেন আমরা ঠিক ওই দিনের মতো শান্ত , স্থির , সুন্দর ভাবে ওই নবসূচনাকে অন্তরে স্থাপন করতে পারি। তাহলেই যতই ঝড় আসুক না কেন , কোনো কিছুই লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে পারবেনা। ছাদ থেকে ফিরে শুলাম একটু, চোখ ও বন্ধ হয়ে এসেছিলো, কিন্তু অর্ধ জাগরণে শুধু ওই কথাই মনে আনাগোনা করছিলো। পৌঁছে দিতে ইচ্ছে করছিলো কোথাও, নিজের সেই সদ্যপ্রাপ্তি কে। কিন্তু সেদিন সুর বারবার কেটে যাচ্ছিলো, তাল মিলছিলনা।  অবশেষে আবার সুর খুঁজে পেলাম। কিন্তু তখন আমার আর কিছু বিশদ ভাবে বলা হয়ে উঠলোনা। দরকার ছিলোনা। কারণ ঠিক আমার মনের কথার ই প্রতিধ্বনি শুনতে পেলাম যে "প্রকৃতি নিজের নিয়মে আবার সব ঠিক করে দেবে। সব কিছু আবার গুছিয়ে দেবে। " আজ সকালে ল্যাব এ যাবার সময় মনেই হলোনা আগে কখনো কিছু হয়েছে বলে। ...দেখলাম, পৃথিবী সত্যি ই গুছিয়ে নিয়েছে সব কিছু। আমার চাঁপার ও সব কুঁড়ি ঝরে যায়নি দেখলাম। আজ আবার ফুটেছে। 








এ পথ গেছে সেইখানে

  দেখতে দেখতে এক বছর হয়ে গেলো, ছোট্ট ছেলেটা স্কুল এ যাচ্ছে। স্কুল মানে playschool বা daycare. এদেশে ওয়ার্কিং পেরেন্টস দের ছোট্ট ছোট্ট ছানা...